খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 2শে চৈত্র ১৪৩২ | ১৬ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাঙালির সংগীতজগতে মাঝে মাঝে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাদের আগমনে কেবল নতুন গান সৃষ্টি হয় না—একটি সম্পূর্ণ নতুন ভাষা, নতুন ভাবনা এবং নতুন সাংস্কৃতিক দিগন্তের জন্ম হয়। কবির সুমন তেমনই এক বিরল শিল্পী। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যখন বাংলা গান দীর্ঘদিনের অভ্যাসগত ছকে বন্দী, যখন গানের বিষয়বস্তু ঘুরেফিরে একই প্রেম-বিরহের বৃত্তে আবর্তিত—তখনই তিনি এসে যেন সেই স্থবিরতার ওপর ঝড় তুললেন। হারমোনিয়ামের পরিচিত সুর আর ড্রয়িংরুমের গৎবাঁধা আড্ডাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি বাংলা গানের শরীরে ঢেলে দিলেন এক নতুন রক্তস্রোত। আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা কেবল একজন গায়ককে নয়, বরং এক যুগস্রষ্টাকে স্মরণ করি—একজন শিল্পী, যিনি একা হাতে বাংলা গানের দিগন্ত বদলে দিয়েছিলেন।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত “তোমাকে চাই” অ্যালবামটি বাংলা গানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর আগে আধুনিক বাংলা গান প্রধানত দুই ধারায় বিভক্ত ছিল—একদিকে রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুলগীতি, অন্যদিকে চলচ্চিত্রনির্ভর আধুনিক গান। কিন্তু কবির সুমন এসে দেখালেন, গান মানেই কেবল প্রেম বা বিরহের কাব্য নয়; গান হতে পারে শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট, বাসের ভিড়, ফুটপাতের মানুষ, রাজনৈতিক মিছিল, কিংবা একাকী মানুষের নিঃসঙ্গতা।
তিনি গানের ভাষাকে নাগরিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করলেন। তাঁর গানে ঢুকে পড়ল টেলিফোন, ট্রামলাইন, কফিহাউস, মফস্বল, রাজনৈতিক অস্থিরতা—এমন সব উপাদান, যা আগে বাংলা গানে সচরাচর দেখা যেত না। গিটার আর কিবোর্ডকে সঙ্গী করে তিনি যে ব্যক্তিগত, প্রায় কথোপকথনের মতো গায়কীর ভঙ্গি তৈরি করলেন, তা বাঙালি শ্রোতার কাছে ছিল একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা।
বাংলা গানের ইতিহাসে তাই অনেকেই বলেন—
একটি যুগ “সুমন-পূর্ব”, আরেকটি “সুমন-উত্তর”।
কবির সুমন কেবল একজন গায়ক নন; তিনি এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। সংগীতের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন আন্তর্জাতিক পরিসরে। ভয়েস অব আমেরিকা এবং জার্মান বেতারে কাজ করার সময় তিনি বিশ্বরাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে যে গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা তাঁর গানের কথায় এবং লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁর গদ্যেও রয়েছে একই রকম তীক্ষ্ণতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দীপ্তি। প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর লেখনী একাধারে ব্যক্তিগত, আবার একই সঙ্গে গভীর সামাজিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ। সংগীতচর্চার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বহুমুখী—গিটার, পিয়ানো, বাঁশি—সবকিছুতেই তাঁর দখল ছিল স্বচ্ছন্দ।
সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বাংলা গানে জনপ্রিয় করেছিলেন একক পরিবেশনার সংস্কৃতি—যেখানে একজন শিল্পী একাই গিটার বা কিবোর্ড নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান, গল্প, মন্তব্য—সব মিলিয়ে এক অনন্য শিল্পভুবন তৈরি করেন। আজকের বহু তরুণ সংগীতশিল্পী সেই পথ ধরেই এগিয়ে চলেছেন।
কবির সুমনের শিল্পীসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর স্পষ্ট রাজনৈতিক ও মানবিক অবস্থান। ধর্ম, জাতপাত কিংবা সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর গান যেমন মানবিকতার কথা বলে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিজীবনও সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন।
নজরুল ইসলামের পর বাঙালি সংস্কৃতিতে যে সাহসী অসাম্প্রদায়িক কণ্ঠের প্রয়োজন ছিল, অনেকেই মনে করেন কবির সুমন সেই শূন্যস্থান আংশিকভাবে পূরণ করেছেন। তাঁর গান যেমন প্রতিবাদের ভাষা, তেমনি মানবিকতারও ভাষা।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর অসাধারণ। জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও তিনি আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল রেকর্ডিং এবং খেয়াল সংগীতের চর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। একজন শিল্পীর সৃজনশীল অস্থিরতা এবং নতুনের প্রতি কৌতূহল তাঁর জীবনকে সবসময় তরতাজা রেখেছে।
যে শিল্পী যুগ বদলে দেন, তাঁকে ঘিরে বিতর্কও জন্ম নেয়—এটাই ইতিহাসের নিয়ম। কবির সুমনও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কিংবা তীব্র ভাষা—সবকিছুই তাঁকে বহুবার সমালোচনার মুখে ফেলেছে।
কিন্তু তবু এক অদ্ভুত সত্য রয়ে গেছে। যখন কোনো প্রেমিক তার প্রিয় মানুষকে ডাকার ভাষা খুঁজে পায় না, যখন কোনো নাগরিক তার শহরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে চায়, কিংবা যখন কোনো প্রতিবাদী মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়—তখন অজান্তেই ফিরে আসে সুমনের গান।
তাঁর গান যেন বাঙালির অন্তর্গত অনুভূতির এক গোপন অভিধান।
“হাল ছেড়ো না বন্ধু”, “জাতিস্মর”, “তোমাকে চাই”—এই গানগুলো আজ আর কেবল গান নয়; এগুলো বাঙালির আবেগ, স্মৃতি এবং সময়ের দলিল। কবির সুমন আমাদের শিখিয়েছেন, গান কেবল সুর নয়—গান হতে পারে কবিতা, প্রতিবাদ, আত্মকথন এবং সময়ের ইতিহাস।
আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা তাঁকে কেবল শুভেচ্ছাই জানাই না; আমরা কৃতজ্ঞতাও জানাই—বাংলা গানের ভুবনকে নতুন করে ভাবতে শেখানোর জন্য।
দীর্ঘায়ু হোন, সুস্থ থাকুন।
আর আমাদের শেখাতে থাকুন—
নিজের শর্তে বাঁচার সাহস কাকে বলে।
শুভ জন্মদিন কবির সুমন।
বাঙালির কানে সুরের নতুন ভাষা এনে দেওয়ার জন্য আপনাকে সালাম ও প্রণাম।