খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
নরসিংদীতে চাঁদা দাবি ও তা না পেয়ে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী উদ্যোক্তাকে মারধর এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগে বিএনপি নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) ভুক্তভোগী নারী উদ্যোক্তা নিজে বাদী হয়ে নরসিংদীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি হলেন মনোহরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলন। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন একই উপজেলার হাররদিয়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল জব্বার এবং অর্জুনচর এলাকার বাসিন্দা মোক্তার উদ্দিন তালুকদার।
মামলার বিবরণী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনোহরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলন এবং তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ওই অন্তঃসত্ত্বা নারী উদ্যোক্তার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভুক্তভোগী নারীকে বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ মে দুপুরে অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে ওই নারীর মালিকানাধীন বিউটি পার্লারে জোরপূর্বক প্রবেশ করেন এবং পুনরায় এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
উদ্যোক্তা নারী চাঁদা দিতে পুনরায় অস্বীকৃতি জানালে অভিযুক্তরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালান। এ সময় অন্তঃসত্ত্বা ওই নারীকে প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে উপর্যুপরি পেটাতে থাকেন আসামিরা। মারধরের একপর্যায়ে ওই নারী মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বিএনপি নেতা আমিনুর রহমান সরকার দোলন তাঁর পরনের কাপড়চোপড় টেনেহিঁচড়ে শ্লীলতাহানি করেন এবং ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন।
আদালতে দায়ের করা মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, মারধর ও শ্লীলতাহানির পাশাপাশি আসামিরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ ও অলঙ্কার লুটপাট করেছেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মারধরের সময় আব্দুল জব্বার নামের দ্বিতীয় আসামি বিউটি পার্লারের ক্যাশ বাক্সের ড্রয়ার ভেঙে ভেতরে থাকা নগদ ৫২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন। একই সময়ে মোক্তার উদ্দিন তালুকদার নামের তৃতীয় আসামি ভুক্তভোগী অন্তঃসত্ত্বা নারীর গলায় থাকা আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের হার জোরপূর্বক টেনে ছিঁড়ে নিয়ে যান। হামলার সময় ভুক্তভোগী নারীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ও ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এলে আসামিরা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে উপস্থিত লোকজন আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় ওই অন্তঃসত্ত্বা নারীকে উদ্ধার করে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং সেখানে তাঁকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।
ভুক্তভোগী নারী উদ্যোক্তা জানান, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে তিনি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মনোহরদী থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন। তবে মনোহরদী থানা-পুলিশ প্রথমে তাঁর মামলাটি সরাসরি রেকর্ড করতে রাজি হয়নি এবং তাঁকে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিতে বলে। ভুক্তভোগীর দাবি অনুযায়ী, তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ কোনো মামলা নথিভুক্ত করেনি। থানায় মামলা নিতে গড়িমসি করার কারণে এবং কোনো প্রতিকার না পেয়ে অবশেষে গত ১৮ জুন তিনি নরসিংদীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে এই নালিশি মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বিষয়ে অভিযুক্ত মনোহরদী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুর রহমান সরকার দোলন তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, এই ধরনের কোনো মারধর বা শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেনি। মূলত একটি পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ার কারণে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে, থানায় মামলা নিতে গড়িমসি করার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন মনোহরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর বাদশা। তিনি জানান, এই ধরনের কোনো মারধর বা শ্লীলতাহানির ঘটনা তাঁর জানা নেই এবং কোনো নারীও এই ধরনের কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেননি।
এই বিষয়ে নরসিংদী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনের সংসদ সদস্য মন্জুর এলাহী জানান, ঘটনাটি একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হতে পারে। রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে এই মামলাটি করা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং তদন্ত শেষেই কেবল এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব।