খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
ভূরাজনৈতিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের এক নতুন সমীকরণে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ঢাকা ও বেইজিং। চীনের নেওয়া বৈশ্বিক চার বড় উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বেইজিংয়ে সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চলমান রাষ্ট্রীয় সফরেই এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে বলে জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই বহুমাত্রিক প্ল্যাটফর্মে শামিল হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পাবে।
চীন মূলত উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা এবং সুশাসন—এই চার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে কেন্দ্র করে তাদের বৈশ্বিক উদ্যোগগুলোর রূপরেখা ঘোষণা করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দাবি, বিশ্বজুড়ে টেকসই উন্নয়ন অর্জন এবং একটি সুষম আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য। তবে বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল’ (আইপিএস)-কে কাউন্টার করা বা ঠেকানোই বেইজিংয়ের এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। প্রায় পাঁচ বছর আগে দুই পরাশক্তির নিজ নিজ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে দুপক্ষ থেকেই আলাদা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এতদিন পর্যন্ত ভূরাজনীতিতে কঠোরভাবে নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে ঢাকা কোনো পক্ষেই সরাসরি যোগ দেয়নি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, নতুন সরকার জাতীয় স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যেকোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে শামিল হতে প্রস্তুত।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে বিশেষ করে চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ বা বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরে বলেন, উন্নয়ন বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত এই উদ্যোগগুলোর সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত রূপ দেওয়া বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় বেশ জটিল। তবে এই ধরনের তাত্ত্বিক ও কৌশলগত উদ্যোগে অংশ নিলে চীন যেমন খুশি হবে, তেমনই বাংলাদেশেরও বড় কোনো ক্ষতি বা হারানোর ঝুঁকি নেই; কারণ এখানে কোনো সামরিক বা কঠিন বাধ্যতামূলক বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে বেইজিংয়ের কাছাকাছি যাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব এবং ভারসাম্যের কূটনীতি বজায় রাখা পুরোপুরি সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ওবায়দুল হক এই বিষয়ে মনে করেন, চীন কীভাবে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চায় এবং তার সাথে বাংলাদেশ কতটুকু নিজেদের মেলাতে পারবে, সেই স্বাধীন সিদ্ধান্ত ঢাকাকেই নিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো কারণে অসন্তুষ্ট বা বৈরি ভাবাপন্ন হয়, তবে তাদের সাথে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই অনেক জটিল আন্তর্জাতিক সংকটের সহজ সমাধান বের করে আনা সম্ভব।
এদিকে এই ঐতিহাসিক সফরে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে চীনে পৌঁছেছেন। সফরে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। সোমবার স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটি চীনের মাটিতে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে তাঁদের বর্ণাঢ্য আয়োজনে স্বাগত জানান লিয়াওনিং প্রদেশের ভাইস গভর্নর এবং চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। আগামী তিন দিন প্রধানমন্ত্রী চীনে অবস্থান করবেন এবং দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সাথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবেন।