খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল ২০২৫
‘যতদূর চোখ গেছে, সামনে যা পেয়েছি, সবই গুঁড়িয়ে দিয়েছি। যেখানে সামান্য নড়াচড়াও চোখে পড়েছে, গুলি চালিয়ে তা থামিয়ে দিয়েছি। ফিলিস্তিনিরা যেন আর কোনোদিন এই জায়গায় ফিরতে না পারে, সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি।’
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর পরিচালিত নিধনযজ্ঞের এমনই ভয়াবহ বিবরণ উঠে এসেছে সেনাদের স্বীকারোক্তিতে। পরিচয় গোপন রেখে নিজেদের কর্মকাণ্ডের কথা জানিয়েছে কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা।
তারা জানান, বাফার জোনকে পরিকল্পিতভাবে রূপান্তর করা হয়েছে ‘মৃত্যুকূপে’— যেখানে ৫০০ মিটার দূরেও কাউকে দেখা গেলে, সে নারী হোক বা শিশু, গুলি চালানো হতো। বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনিরা জানেন না ঠিক কোথায় বাফার জোনের সীমা। সেই অজানায় পা রেখেই তারা পড়েছেন মৃত্যু ফাঁদে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেনা বলেন, ‘২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস আমাদের হত্যা করেছিল, তাই প্রতিশোধ নিতে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখি, শুধু তাদের নয়—তাদের পরিবার, সন্তান, এমনকি পোষা প্রাণী পর্যন্ত নির্বিচারে মারা হচ্ছে।’
অনেক সেনা নিজেরাও স্বীকার করেছেন, ৭ অক্টোবরের ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই তারা এভাবে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছেন।
সোমবার (৭ এপ্রিল) স্থানীয় সময় ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ নামের একটি দখলবিরোধী সাবেক সেনাদের সংগঠন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বর্ণনা করা হয় কীভাবে গাজার ভূমি দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
সোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) সাক্ষাৎকার দেওয়া পাঁচজন সেনা জানান, তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বাফার জোনের মধ্যে থাকা প্রতিটি ফসলের মাঠ, সেচ ব্যবস্থার সরঞ্জাম, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ধ্বংস করতে—যাতে হামাস যোদ্ধারা আশ্রয় নিতে না পারে।
তারা জানান, এত ব্যাপক মাত্রায় ধ্বংস চালানো হয়েছে, তা গণনা করাও অসম্ভব।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত বাফার জোন, নিঃস্ব মানুষেরা
যে জায়গায় আজ বাফার জোন, এক সময় ছিল ফিলিস্তিনিদের কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর জনপদ। কৃষিকাজে ব্যবহৃত এসব জমি ছিল গাজার গুরুত্বপূর্ণ রুটিরুজির উৎস।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, এই এলাকাগুলোতে এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই—সবকিছুই ধ্বংসস্তূপ।
গত ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করলে বাফার জোনে আরও সৈন্য মোতায়েন করে ইসরায়েল।
এর আগে ১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে নিজ ভিটায় ফিরে গিয়েছিলেন ৫৫ বছর বয়সী কৃষক নিদাল আলজানিন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, বাড়িঘর কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
নিদাল ফিরে পেয়েছিলেন শুধু স্ত্রীর সঙ্গে তোলা একটি বিবাহের ছবি, ছেলের মুখ আঁকা একটি চীনামাটির প্লেট এবং দেড়শ বছরের পুরনো একটি ডুমুর গাছ। তিনি বলেন, ‘এই বাড়ি তৈরি করতে আমার ২০ বছর সময় লেগেছিল। অথচ মাত্র ৫ মিনিটেই তারা সব শেষ করে দিল। শুধু আমার ঘর নয়, আমার স্বপ্ন, সন্তানদের ভবিষ্যত—সব ছিনিয়ে নিয়েছে।’
নিদালের এই আর্তনাদ গাজা উপত্যকার লাখো মানুষের। ঘরবাড়ি, পরিবার ও স্বপ্নহারা ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধবিরতির পর ধ্বংসস্তূপেই তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছিলেন। কিন্তু সেটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। যুদ্ধবিরতির নামে নানা নাটকের মধ্যেই ১৮ মার্চ সেহেরির সময় ইসরায়েলি বাহিনী নতুন করে আক্রমণের নির্দেশ দেয়। আবার শুরু হয় জীবন বাঁচানোর জন্য পলায়ন।
এই নতুন হামলায় কমপক্ষে ১ হাজার ৩৩৫ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৩ হাজার ২৯৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হামাস-শাসিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
২০২৩ সালের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৬৯৫ জনে, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। পাশাপাশি, পোলিও টিকার অভাবে গাজার ৬ লাখ ২ হাজার শিশু রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।
সূত্র: ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স, ইউএনবি
খবরওয়ালা/আরডি