খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬
পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি ধীরে ধীরে কমে আসছে এবং এর ফলে প্রতিদিনের দৈর্ঘ্য ক্রমশ বাড়ছে—সম্প্রতি প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই পরিবর্তন কেবল স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফল নয়; বরং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষত মেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে গিয়ে সমুদ্রের পানির বণ্টন বদলে দিচ্ছে, যা পৃথিবীর ঘূর্ণনগতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
গবেষণা অনুযায়ী বর্তমানে পৃথিবীর দিন প্রতি শতাব্দীতে প্রায় সেকেন্ডের সহস্র ভাগের এক দশমিক তেত্রিশ ভাগ করে দীর্ঘতর হচ্ছে। গত প্রায় ছত্রিশ লাখ বছরের মধ্যে দিন দীর্ঘ হওয়ার এই গতি এত বেশি কখনো দেখা যায়নি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণায়নের কারণে মেরু অঞ্চলের বিশাল বরফস্তর ও হিমবাহ দ্রুত গলছে। গলিত বরফের পানি সমুদ্রপথে বিষুবরেখা অঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পৃথিবীর ভরবণ্টনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর ফলে গ্রহটির ঘূর্ণনের গতি সামান্য হলেও কমে যাচ্ছে।
এই বিষয়টি বোঝাতে গবেষকেরা একটি পরিচিত উদাহরণ দিয়েছেন। যখন কোনো নৃত্যশিল্পী দ্রুত ঘোরেন, তখন তিনি হাত শরীরের কাছাকাছি রাখলে দ্রুত ঘুরতে পারেন। কিন্তু হাত ছড়িয়ে দিলে তার ঘূর্ণন ধীর হয়ে যায়। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম প্রভাব ঘটছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে পানি যখন বিষুবরেখার দিকে সরে যায়, তখন ভরের অবস্থান অক্ষ থেকে দূরে সরে গিয়ে পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ধীর করে দেয়।
গবেষকেরা অতীতের জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। এ কাজে তারা সমুদ্রের গভীরে বসবাসকারী এক ধরনের প্রাচীন এককোষী জীবের জীবাশ্ম পরীক্ষা করেছেন। এই জীবের খোলসের রাসায়নিক গঠন থেকে অতীতের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে পদার্থবিজ্ঞানের নীতিনির্ভর গণনাভিত্তিক একটি উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করে গত কয়েক মিলিয়ন বছরের দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন নির্ধারণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় বিশ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে এমন একটি সময় ছিল যখন গ্রিনল্যান্ড অঞ্চলে বিশাল বরফস্তর ছিল না এবং অঞ্চলটি বনভূমিতে আচ্ছাদিত ছিল। সেই সময়েও পৃথিবীর ঘূর্ণনগতিতে কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। তবে বর্তমান শতাব্দীতে যে দ্রুততার সঙ্গে পরিবর্তন ঘটছে, তা অতীতের যেকোনো প্রাকৃতিক পরিবর্তনের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত।
এই পরিবর্তনের একটি সারসংক্ষেপ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| সময়কাল | দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির হার | পরিবর্তনের প্রধান কারণ |
|---|---|---|
| প্রায় ২০ লাখ বছর আগে | তুলনামূলক কম বৃদ্ধি | প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তন |
| সাম্প্রতিক শতাব্দী | প্রতি শতাব্দীতে সেকেন্ডের সহস্র ভাগের প্রায় ১.৩৩ অংশ | উষ্ণায়নে বরফ গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন |
| সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ (এই শতাব্দীর শেষভাগ) | প্রতি শতাব্দীতে প্রায় সেকেন্ডের সহস্র ভাগের ২.৬২ অংশ পর্যন্ত | তীব্র জলবায়ু পরিবর্তন |
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের কাছে সেকেন্ডের এত ক্ষুদ্র অংশের পরিবর্তন তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, মহাকাশযানের গতিপথ নির্ধারণ, উপগ্রহভিত্তিক অবস্থান নির্ধারণ ব্যবস্থা এবং বিশ্বব্যাপী সময় নির্ধারণে ব্যবহৃত অত্যন্ত সূক্ষ্ম পারমাণবিক ঘড়ির সমন্বয়ের জন্য সঠিক সময় গণনা অপরিহার্য। দিনের দৈর্ঘ্যে সামান্য পরিবর্তনও এসব ব্যবস্থায় ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষকেরা আরও বলেছেন, একবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে গিয়ে পরিস্থিতি আরও লক্ষণীয় হতে পারে। বিশেষ করে ২০৮০–এর দশক থেকে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ার ক্ষেত্রে চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাবের তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তখন দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির হার আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই গবেষণা নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কেবল তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা আবহাওয়ার অস্থিরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি পৃথিবীর মৌলিক ভৌত প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিবর্তনের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।