খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আগামীকাল, মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবারের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে, যেখানে বাবা-মায়ের পর তিনিই দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসছেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে কিছু পরিবার রয়েছে, যেখানে তিন প্রজন্মের একাধিক সদস্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। জিয়া পরিবার সেই বিরল পরিবারের মধ্যে স্থান নিচ্ছে। বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়ার পর এবার রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত হচ্ছেন ছেলে তারেক রহমান।
| নাম | পদ | সময়কাল | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| জিয়াউর রহমান | রাষ্ট্রপতি | ১৯৭৭–১৯৮১ | সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতি; বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৭৮ সালে |
| খালেদা জিয়া | প্রধানমন্ত্রী | ১৯৯১–১৯৯৬, ২০০১–২০০৬, ২০০৮–২০১৪ | বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী; বিএনপির চেয়ারপারসন |
| তারেক রহমান | রাষ্ট্রপ্রধান (আসন্ন) | ২০২৬–বর্তমান | ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন; বিএনপির চেয়ারপারসন |
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।
তারেক রহমান ১৭ বছরের নির্বাসনের পর যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে দলকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেন। এবার তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের জিয়া পরিবারের মতো কিছু বিদেশী রাজনৈতিক পরিবারও এই বিরল রেকর্ড ধারণ করেছে।
| দেশ | পরিবার | প্রথম প্রজন্ম | দ্বিতীয় প্রজন্ম | তৃতীয় প্রজন্ম | মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|---|
| ভারত | নেহেরু-গান্ধী | জওহরলাল নেহেরু | ইন্দিরা গান্ধী | রাজীব গান্ধী | মা–ছেলে দু’জনই প্রধানমন্ত্রী; ইন্দিরা ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী |
| পাকিস্তান | ভুট্টো | জুলফিকার আলী ভুট্টো | বেনজির ভুট্টো | বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি | জুলফিকার–প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী; বেনজির প্রথম মুসলিম বিশ্বের নারী প্রধানমন্ত্রী |
| শ্রীলঙ্কা | বন্দারনায়েকে | এসডব্লিউআরডি বন্দারনায়েকে | শ্রীমাভো বন্দারনায়েকে | চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা | মা–ছেলে দু’জনই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন |
| থাইল্যান্ড | সিনাওয়াত্রা | থাকসিন সিনাওয়াত্রা | ইংলাক সিনাওয়াত্রা | পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা | পরিবার থেকে তিনজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন |
| উত্তর কোরিয়া | কিম | কিম ইল-সাং | কিম জং-ইল | কিম জং-উন | তিন প্রজন্মের নেতৃত্ব; কিম জং-উনের উত্তরসূরি কিম জু-আয়ে |
ভারতের স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহেরু। ১৯৬৪ সালে অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং দুই মেয়াদে ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮৪ সালে নিহত হওয়ার পর ছেলে রাজীব গান্ধী ৪০ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো প্রথম মুসলিম বিশ্বের নারী প্রধানমন্ত্রী হন। বর্তমানে তার ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক নেতা।
এসডব্লিউআরডি বন্দারনায়েকে হত্যার পর তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দারনায়েকে প্রধানমন্ত্রী হন। তাদের মেয়ে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয় পদে ছিলেন, যা বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল।
থাইল্যান্ডে থাকসিন সিনাওয়াত্রা, তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা, এবং ভাগ্নি পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা তিনজনই প্রধানমন্ত্রী পদে পৌঁছেছেন। পেতংতার্ন দেশের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী ও দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
উত্তর কোরিয়ায় কিম ইল-সাং, কিম জং-ইল, এবং কিম জং-উন—তিন প্রজন্মের নেতা দেশ পরিচালনা করেছেন। কিম জং-উনের বয়স মাত্র ২০-এর মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন।
গ্রিসের পাপানড্রেউ পরিবার, নিকারাগুয়া ও পেরুর সামোজা এবং প্রাদো পরিবার থেকেও তিন প্রজন্মের নেতা রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।
একই পরিবারের দুটি প্রজন্মের নেতা দেখা গেছে:
যুক্তরাষ্ট্র: জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ ও জর্জ ডব্লিউ বুশ (বাবা–ছেলে)
বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা (বাবা–মেয়ে)
সিঙ্গাপুর: লি কুয়ান ইউ ও লি সেইন লুং (বাবা–ছেলে)
কানাডা: পিয়েরে ট্রুডো ও জাস্টিন ট্রুডো (বাবা–ছেলে)
ইন্দোনেশিয়া: সুকর্ণ ও মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী (বাবা–মেয়ে)
রাজনীতিতে পরিবারভিত্তিক নেতৃত্বের ইতিহাস দেখালে বোঝা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিছু প্রভাবশালী পরিবার রয়েছে যারা তিন প্রজন্মের মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে জিয়া পরিবার এই বিরল তালিকায় নাম লিখিয়েছে—বাবা, মা ও ছেলে তিনজনই শীর্ষ পদে বসছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে এরকম নজির কমই দেখা যায়, যা প্রমাণ করে পরিবারভিত্তিক রাজনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, জিয়া পরিবারের ইতিহাস আন্তর্জাতিক মানের বিরল এক দৃষ্টান্ত। দেশের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেয়ার মাধ্যমে তারেক রহমান এ পরিবারের রাজনৈতিক যাত্রার তৃতীয় অধ্যায় শুরু করছেন, যা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।