খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্বখ্যাত ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ম্যাকিনসে অ্যান্ড কোম্পানি (McKinsey & Company) তাদের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বীমা খাতের এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বীমা খাতে অতিরিক্ত ৫০ বিলিয়ন থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই প্রযুক্তি কেবল কার্যক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং বীমা শিল্পের দীর্ঘদিনের প্রচলিত মডেলে আমূল পরিবর্তন আনবে।
ম্যাকিনসের তথ্যমতে, জেনারেটিভ এআই-এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হবে বিপণন (Marketing), গ্রাহক সেবা (Customer Operations) এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। বিশেষ করে বীমা পলিসি অনুমোদন বা ‘আন্ডাররাইটিং’ প্রক্রিয়ায় এআই এক অভাবনীয় গতি সঞ্চার করেছে। আগে যেখানে একটি বিমার আবেদন যাচাই-বাছাই করে কোটেশন দিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগত, এআই-এর কল্যাণে তা এখন মাত্র কয়েক দিনে নেমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে ২-৩ দিনের কাজ এখন মাত্র ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের গতি কিছুটা ধীর থাকলেও বীমা খাত ছিল অত্যন্ত চাঙ্গা। বিশেষ করে প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগকারীরা বীমা সম্পদগুলোর ওপর আস্থা রাখছেন। তবে বাজারের পরিপক্কতার কারণে ব্রোকার লেনদেনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে, থার্ড-পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (TPA) এবং ম্যানেজিং জেনারেল এজেন্ট (MGA) শাখাগুলোতে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো।
বীমা খাতের বিভিন্ন শাখার বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির চিত্র:
| খাতের নাম | প্রবৃদ্ধির হার / প্রভাব | বর্তমান অবস্থা (২০২৪-২৬ প্রেক্ষাপট) |
| জেনারেটিভ এআই | $৫০ – $৭০ বিলিয়ন | অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা। |
| এমজিএ (MGA) | ১৪% (বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি) | ২০২০ সালে ৪৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে ৯৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত। |
| টিপিএ (TPA) | ১৫% (গড় বার্ষিক) | গত ৫ বছরে বিনিয়োগে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। |
| ইউএস বিনিয়োগ | ২৬% (বার্ষিক) | ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমাগত বিনিয়োগ বৃদ্ধি। |
| ইউরোপীয় বিনিয়োগ | ১৮% (হ্রাস) | ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিনিয়োগে নিম্নগতি। |
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বীমা খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বীমা খাতে প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ প্রতি বছর গড়ে ২৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই যুক্তরাষ্ট্রে ১৬৪টি চুক্তির মাধ্যমে ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ইউরোপের চিত্র কিছুটা ভিন্ন; সেখানে একই সময়ে বিনিয়োগের পরিমাণ গড়ে ১৮ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে।
ম্যাকিনসের মতে, এআই বর্তমান বীমা মডেলগুলোকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে না, বরং সেগুলোকে আরও দক্ষ ও যুগোপযোগী করে তুলবে। যেসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত এই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারবে এবং বড় পরিসরে এর প্রয়োগ ঘটাতে সক্ষম হবে, তারাই ভবিষ্যতে বাজারের মূল নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে। সফটওয়্যার এবং ডেটা প্রোভাইডারদের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ এই খাতগুলো থেকে নিয়মিত রাজস্ব আসার নিশ্চয়তা থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, জেনারেটিভ এআই বীমা খাতের জন্য কেবল একটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন থেকে শুরু করে জটিল সফটওয়্যার তৈরি—সবক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বীমা শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।