খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে যে নামটিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তিনি হলেন জেফরি এপস্টেইন। সাধারণ একজন স্কুলশিক্ষক থেকে ওয়াল স্ট্রিটের প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী এবং বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার গল্পটি যেমন রহস্যময়, তেমনি ভয়ঙ্কর। ২০১৯ সালে কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যুর পর সম্প্রতি প্রকাশিত লক্ষ লক্ষ পৃষ্ঠার ‘এপস্টেইন ফাইলস’ এই অন্ধকার জগতের পর্দার অন্তরালের সত্যগুলো সামনে নিয়ে আসছে।
নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহরের অভিজাত প্রাইভেট স্কুল ‘ডাল্টন’-এ গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। যদিও তিনি স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি, কিন্তু তার মেধা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক তাকে ওয়াল স্ট্রিটের বিখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক ‘বিয়ার স্টিয়ার্নস’-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মাত্র চার বছরের মাথায় তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়ে ওঠেন, যা তার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয়।
১৯৮২ সালে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কোম্পানিটি কেবল ১০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদধারী গ্রাহকদের সেবা প্রদান করত। অতি দ্রুত বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে এপস্টেইন ফ্লোরিডায় রাজকীয় প্রাসাদ এবং নিউইয়র্কে বিশাল ব্যক্তিগত বাড়ি গড়ে তোলেন।
এপস্টেইনের সাফল্যের একটি বড় অংশ ছিল বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সখ্যতা। ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বিল ক্লিনটন এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু—সবার সাথেই তার ওঠাবসা ছিল। ২০০২ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘দারুণ মানুষ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়, তবে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির ভ্রমণের নথি এখন জনসমক্ষে।
যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক হার্ভে ওয়েইনস্টিনের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গেও তার সখ্যতা ছিল। এই ঘনিষ্ঠতা তাকে এমন এক সামাজিক রক্ষা কবচ প্রদান করেছিল, যার আড়ালে তিনি দীর্ঘকাল তার অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে গেছেন।
এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক যৌনবৃত্তির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। ২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় প্রথম তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ২০০৮ সালে তিনি কৌশলে এক ‘গোপন সমঝোতা চুক্তি’র মাধ্যমে বড় ধরণের শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যান। ফেডারেল কৌঁসুলি অ্যালেক্সান্ডার অ্যাকোস্টা এমন এক চুক্তি করেছিলেন যার ফলে এপস্টেইন মাত্র ১৩ মাস কারাদণ্ড পান এবং দিনের বেলা কাজ করার সুযোগ পেতেন। একেই পরবর্তীতে ‘শতাব্দীর চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
| সময়কাল | উল্লেখযোগ্য ঘটনা |
| ১৯৭০-এর দশক | ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকতা। |
| ১৯৮২ | নিজস্ব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও ধনকুবের হয়ে ওঠা। |
| ২০০২ | বিল ক্লিনটন ও প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যতা। |
| ২০০৮ | প্রথম সাজা এবং বিতর্কিত সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি। |
| ২০১৯ | পুনরায় গ্রেপ্তার এবং নিউইয়র্কের কারাগারে রহস্যজনক মৃত্যু। |
| ২০২৫ | ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ এর মাধ্যমে গোপন নথি প্রকাশ। |
এপস্টেইনের এই অপরাধ সাম্রাজ্যের অন্যতম কারিগর ছিলেন তার দীর্ঘদিনের বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। তিনি কেবল এপস্টেইনের ঘর সামলাতেন না, বরং প্রভাবশালী বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং কম বয়সী মেয়েদের প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করার মূল কাজটি করতেন। ২০২১ সালে গিলেনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিচার চলাকালীন তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “এপস্টেইনের সঙ্গে দেখা হওয়াটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।”
২০২৫ সালে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ অনুমোদনের পর বিচার বিভাগ এখন সব গোপন নথি প্রকাশ করছে। এই নথিগুলো কেবল এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে বছরের পর বছর ফাঁকি দেওয়া যায়, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। যদিও এপস্টেইন এখন মৃত, কিন্তু ভুক্তভোগী নারীদের লড়াই এবং প্রভাবশালী নেপথ্য অপরাধীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি এখনও চলমান।