খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আলোচ্যসূচিতে আবারও উঠে এসেছে সুদানের গৃহযুদ্ধের বিষয়টি।
হোয়াইট হাউস আগে থেকেই সুদানের জটিল পরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়ে আসছিল। বিশেষত ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) চলমান সংঘাত নিয়ে। তবে সৌদি যুবরাজের সফর এই আগ্রহকে আরও জোরদার করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লোহিত সাগর জাতীয় নিরাপত্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কারণে তাদের অগ্রাধিকারও সে অনুযায়ী নির্ধারিত হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস এর আগেই সতর্ক করেছিল, সুদানের যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। শান্তির পথ সুগম করতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে একাধিক দফায় আলোচনা হয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমন্বয়ে ‘কোয়াড’ যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, সুদানের যুদ্ধ আগে তার ‘এজেন্ডায় ছিল না’, তবে যুবরাজের অনুরোধে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এই মন্তব্য বড় কোনো কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না; বরং এটা সৌদি যুবরাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের ইঙ্গিত হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
এটি মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য আঞ্চলিক নেতৃত্ব ও শান্তি মধ্যস্থতার জায়গায় আরও দৃঢ়ভাবে ওঠার সুযোগ। একইসঙ্গে এর মাধ্যমে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর সুদান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতাও জোরদার হয়েছে। শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদের সঙ্গে কথা বলেন, যা সুদান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা এবং কোয়াড অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
জাতিসংঘ বহুবার জানিয়েছে, সুদান বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটগুলোর একটির মুখোমুখি। আগেভাগে হস্তক্ষেপ করা গেলে বহু প্রাণহানি রোধ করা যেত। যেমন সম্প্রতি এল-ফাশির শহরটি আরএসএফের দখলে যাওয়ার আগে পদক্ষেপ নেওয়া গেলেও ব্যাপক নৃশংসতা ঠেকানো সম্ভব হতো। দেশটিতে এখন খাদ্য–পানি সংকট, জরুরি অবকাঠামো ধ্বংস ও বিপুল বাস্তুচ্যুতি চরম মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুদানের যুদ্ধকে বহুসময় ‘ভুলে যাওয়া সংঘাত’ বলা হয়, কারণ বড় শক্তিগুলোর অগ্রাধিকারের বাইরে থাকে বিষয়টি। ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা সাময়িকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ফিকে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সুদানের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বাধীন সার্বভৌম পরিষদ সৌদি আরবের উদ্যোগকে প্রথমেই স্বাগত জানায়। ট্রাম্পের বক্তব্যেও তারা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা কোয়াডের মানবিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পরোক্ষভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও এবার অবস্থান বদলেছে। কারণ হতে পারে—ট্রাম্পের সরাসরি তত্ত্বাবধানে শান্তি প্রক্রিয়া নতুন গুরুত্ব পেয়েছে, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা মেনে নিতে গিয়ে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া।
এদিকে আরএসএফ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানালেও সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণকারীদের ‘শান্তির পথে বাধা’ বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে তারা সংকটের মূল কারণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।
এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে তা এখনও পরিষ্কার নয়। সৌদি-ট্রাম্প সমঝোতা কোয়াডের রূপরেখাকে আমূল বদলে দেবে—এমন ধারণা ভুল। তবে ট্রাম্পের ভূমিকা সমঝোতা বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে পারে।
তবে সুদানের শান্তির পথে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—যারা যুদ্ধ থেকে লাভবান, তারা শান্তির পথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। যুদ্ধবিরতি সফল হলেও তা সাময়িক হতে পারে এবং রাজনৈতিক আলাপ–আলোচনার শুরুতেই ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ট্রাম্পের সম্পৃক্ততা একদিকে দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাব বাড়াতে পারে, আবার ভবিষ্যৎকে বৈশ্বিক দেনদরবারের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।
বুরহানের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া শান্তির একটি সম্ভাব্য জানালা খুললেও সফলতার জন্য প্রয়োজন বাস্তব প্রয়োগ, স্থানীয় নেতৃত্বাধীন অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং দৃঢ় নিশ্চয়তা।
সঠিকভাবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে সুদান নাগরিক নেতৃত্বাধীন ভবিষ্যতের দিকে এগোতে পারে; আর ব্যর্থ হলে তা আবারও নতুন ট্র্যাজেডির জন্ম দিতে পারে।
ওসামা আবুজাইদ গবেষক, গ্রাসরুটস ও মানবিক নিরাপত্তা প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর
মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
খবরওয়ালা/টিএসএন