খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে ২০২৬
বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে উত্তেজনা কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এখন ডিজিটাল জগতের ‘মিম’ সংস্কৃতিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা লক্ষ্য করা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার)। জনপ্রিয় তাস খেলা ‘উনো’ (UNO)-র বিভিন্ন কার্ড ব্যবহার করে দুই দেশের পক্ষ থেকে প্রতীকী বার্তা আদান-প্রদান বিশ্বব্যাপী নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আলোচনার সূত্রপাত হয় হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে দেখা যায়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একগুচ্ছ উনো কার্ড হাতে ধরে আছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) দ্বারা তৈরি বলে প্রতীয়মান হওয়া এই ছবিতে ট্রাম্পের হাতে বেশ কিছু ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ (Wild Card) দেখা যায়। ছবির ক্যাপশনে বড় অক্ষরে লেখা ছিল—‘আই হ্যাভ অল দ্য কার্ডস’ (সব কার্ডই আমার হাতে)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই বার্তার মাধ্যমে মূলত ইরানের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মজার বিষয় হলো, উনো খেলার নিয়ম অনুযায়ী যার হাতে যত বেশি কার্ড থাকে, সে আসলে জয়ের থেকে তত বেশি দূরে থাকে। এই কারিগরি ভুলের কারণে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পকে নিয়ে বেশ হাস্যরসেরও সৃষ্টি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি টেড লিউ কৌতুক করে মন্তব্য করেন, “উনোতে জিততে হলে আপনার হাতে কোনো কার্ড থাকা চলবে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তার জবাবে ইরান অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। হায়দ্রাবাদে অবস্থিত ইরানের কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে একই ঢঙে একটি ছবি পোস্ট করা হয়। সেখানে দেখা যায়, একজন ইরানি সামরিক কর্মকর্তা মুচকি হেসে হাতে মাত্র কয়েকটি উনো কার্ড ধরে আছেন।
ইরানের হাতে থাকা কার্ডগুলোর মধ্যে ‘+৪’ (প্লাস ফোর) এবং ‘স্কিপ’ (Skip) কার্ডগুলো ছিল বিশেষভাবে দৃশ্যমান। উনো খেলায় ‘স্কিপ’ কার্ড ব্যবহার করা হয় প্রতিপক্ষের চাল বাতিল করতে এবং ‘+৪’ কার্ড ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে বাড়তি কার্ড নিতে বাধ্য করা হয়। প্রতীকী অর্থে, ইরান এই কার্ডগুলোর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের দাপটকে রুখে দেওয়ার মতো কৌশলগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল—‘ইয়েস, উই হ্যাভ লেস কার্ডস’ (হ্যাঁ, আমাদের কাছে কার্ড কম আছে), যা খেলার নিয়ম অনুযায়ী তাদের জয়ের নিকটবর্তী অবস্থানকেই নির্দেশ করে।
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ভার্চুয়াল যুদ্ধ কেবল উনো কার্ডেই সীমাবদ্ধ নেই। এর আগে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত ইরান দূতাবাস থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে ‘লিটল অরেঞ্জ ম্যান’ (ছোট্ট কমলা মানুষ) সম্বোধন করে একটি পোস্ট করা হয়েছিল। হরমুজ প্রণালী ও আন্তর্জাতিক নৌপথ নিয়ে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ওই পোস্টে ট্রাম্পের গায়ের রঙের প্রতি ইঙ্গিত করে বিদ্রুপ করা হয়।
দূতাবাসের সেই পোস্টে একটি র্যাপ গানও যুক্ত ছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘লিটল অরেঞ্জ ম্যান’। অ্যানিমেটেড ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় ট্রাম্পের আদলে একটি চরিত্রকে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। ইরানের এই ধরণের প্রচারণাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘সাইবার ট্রোলিং’ বা ‘ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সামাজিক মাধ্যমে পরিচালিত এই ‘মিম যুদ্ধ’ বা ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ বর্তমান সময়ে কূটনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে ইরান বিশ্বজুড়ে তাদের বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে এআই-জেনারেটেড ভিডিও এবং মিম ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে খাটো করার চেষ্টা করছে। ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ (ISD) এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের এই নতুন ডিজিটাল কৌশল বিশ্বব্যাপী তরুণ প্রজন্মের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এই ধরনের মিম যুদ্ধের ঝুঁকিও রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের মতো গুরুতর বিষয়কে বিনোদনের আদলে উপস্থাপন করার ফলে অনেক সময় জনমনে প্রকৃত সংকটের ভয়াবহতা হ্রাস পেতে পারে। পাশাপাশি এটি ভুল তথ্য বা ‘মিসইনফরমেশন’ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের ডামাডোলের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ডিজিটাল লড়াই এখন সামাজিক মাধ্যমের অন্যতম প্রধান ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।