বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য মার্কিন ডলার কেনার সর্বোচ্চ হার আরও কমিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মৌখিক নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রবাসী আয় সংগ্রহের ক্ষেত্রে মানি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে প্রতি মার্কিন ডলার সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা দরে কেনা যাবে।
এর আগে ১৩ এপ্রিল জারি করা নির্দেশনায় এই সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২২ টাকা ৯০ পয়সা। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে হার সামান্য কমানো হয়েছে, যা ধারাবাহিকভাবে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ ও বাজার স্থিতিশীল রাখার নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডলার ক্রয় সীমার পরিবর্তন
| নির্দেশনার তারিখ |
প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ ক্রয়হার |
| ১৩ এপ্রিল |
১২২ টাকা ৯০ পয়সা |
| সর্বশেষ নির্দেশনা |
১২২ টাকা ৮৫ পয়সা |
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, এ ধরনের ঘন ঘন হস্তক্ষেপ বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেফারেন্স বিনিময় হার কাঠামো চালু করলেও সরাসরি মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে হার নিয়ন্ত্রণ বাজার ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এ কারণে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডলারের দর একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডলারের দাম বেশি হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যা পরবর্তীতে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিনিময় হারকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখার চেষ্টা চলছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এক বিশেষজ্ঞ জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বিনিময় হারকে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক করার শর্ত রয়েছে। তবে বাস্তবে এই কাঠামো কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ স্বাভাবিক হলেও তা সাধারণত নিলামসহ বাজারভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে হওয়া উচিত।
বাজার পরিস্থিতি ও প্রবাসী আয়ের অবস্থা
সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। কিছু বেসরকারি ব্যাংক গত সপ্তাহে প্রবাসী আয়ের ডলার প্রায় ১২৩ টাকায় কিনেছে। তবে পরবর্তীতে হার কিছুটা কমে ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৯৫ পয়সার মধ্যে স্থিতিশীল হয়েছে।
নিচে সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| বিষয় |
অবস্থা |
| প্রবাসী আয় ডলার ক্রয়হার |
১২২.৮৫–১২২.৯৫ টাকা |
| কিছু ব্যাংকের উচ্চ ক্রয়হার |
প্রায় ১২৩ টাকা |
| প্রবাসী আয়ের প্রবাহ |
স্থিতিশীল |
| মার্চে ঋণপত্র খোলা |
হ্রাস পেয়েছে |
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৯২ কোটি মার্কিন ডলারে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ডলার সূচক প্রায় শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের দর বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি তুলনামূলক স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে।
তবে মার্চ মাসে ঋণপত্র খোলার পরিমাণ কিছুটা কমলেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে। এতে বাজারে ডলারের সরবরাহ মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, কিছু ব্যাংকের উচ্চ দরে ডলার কেনা এবং অগ্রিম বুকিং বৃদ্ধির কারণে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছিল। পরে অগ্রিম বুকিং বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়।