খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 15শে বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৮ই এপ্রিল ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করছে। পাবনার রূপপুরে নির্মিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিপাত্রে আজ মঙ্গলবার ইউরেনিয়াম জ্বালানি ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশে পরিণত হচ্ছে।
চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশ করানোর পর তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপ থেকে পানিকে বাষ্পে রূপান্তর করা হবে, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে এই জ্বালানি প্রবেশই বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনের পূর্ববর্তী শেষ ধাপ। এরপর ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। আগামী আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত থাকবেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| প্রকল্পের নাম | রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র |
| অবস্থান | পাবনা |
| মোট ইউনিট | ২টি |
| প্রতিটি ইউনিটের সক্ষমতা | ১২০০ মেগাওয়াট |
| জ্বালানি সরবরাহকারী | রোসাটম (রাশিয়া) |
| নির্মাণ ঠিকাদার | অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট |
| জ্বালানি বান্ডিল (প্রথম ইউনিট) | ১৬৩টি ব্যবহৃত, অতিরিক্ত ১টি সহ ১৬৪টি দেশে আনা |
| জ্বালানি ব্যবহারকাল | প্রায় ১৮ মাস |
| প্রকল্প মেয়াদ সম্প্রসারণ | ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত |
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, এই কেন্দ্র জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে এবং দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে।
পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম অক্সাইড থেকে তৈরি ক্ষুদ্র দানা ব্যবহার করা হয়, যা পরে ধাতব নলের মধ্যে রড আকারে এবং একাধিক রড একত্র করে বান্ডিল তৈরি করা হয়। রূপপুরে প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড রয়েছে।
প্রথমে জ্বালানি প্রবেশের পর প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করতে। এরপর পরীক্ষামূলক উৎপাদন, বিকিরণ পরীক্ষা এবং ধাপে ধাপে ক্ষমতা বৃদ্ধি করে চুল্লির সক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছানো হবে। এই পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও প্রায় ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
এরপর জাতীয় গ্রিডে সংযোগ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্থিতিশীল উৎপাদনে পৌঁছাতে প্রায় ১০ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রূপপুর প্রকল্পের ইতিহাস বহু পুরনো। ১৯৬১ সালে প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা স্থগিত হয়। স্বাধীনতার পর পুনরায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়।
বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ আটত্রিশ হাজার ছয়শ ছিয়াশি কোটি টাকা। সময়সীমা কয়েক দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় রয়েছে। ব্যবহৃত জ্বালানি দীর্ঘ সময় তেজস্ক্রিয় থাকে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ করে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করতে হয়।
সব মিলিয়ে রূপপুরে জ্বালানি প্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তব ধাপে প্রবেশ করল, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।