খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫
ড. নীলিমা ইব্রাহিম একাত্তরের এক অসামান্য সাহসী নারী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে দেশ, মানুষ ও নারীর মর্যাদার জন্য কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে।
১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন তিনি, এবং ১৯৭২ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন, তাদের মনোবল পুনর্গঠন ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে আনার যে মহৎ উদ্যোগ শুরু হয়—সেই সংগ্রামের অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে (১৯৭৪–৭৫) দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেতন বা সম্মানী গ্রহণ করেননি—এ ছিল তাঁর দেশপ্রেম ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতীক।
১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামে জন্ম নেন তিনি। পিতা প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী, মাতা কুসুম কুমারী দেবী। খুলনা করোনেশন গার্লস স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতার ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে এম.এ. এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বিটি সম্পন্ন করেন।
১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর বিয়ে হয় ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি “নীলিমা রায় চৌধুরী” থেকে হয়ে যান “নীলিমা ইব্রাহিম”—এক নাম, যা পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে বাংলাদেশে নারীজাগরণের প্রতীক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরুর পর থেকেই তিনি যুক্ত ছিলেন সমাজ ও রাজনীতির জাগরণধারায়। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ছাত্র-যুব সমাজের প্রেরণার উৎস।
২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতে তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই—চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করেছেন পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। পরে নারিন্দা ও ঢাকার বাইরে আশ্রয় নিয়েও তিনি থেমে থাকেননি; মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ, প্রচারপত্র বিলি ও ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত করার কাজে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর এই কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে টিক্কা খান তাঁকে সতর্কতামূলক চিঠি পাঠান—যা আজও জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
স্বাধীনতার পরও তিনি যুদ্ধাহত নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অকুতোভয়ে। নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে অসংখ্য বীরাঙ্গনাকে সম্মানের সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদের বেদনাময় জীবনের সাক্ষী হয়ে লিখেছেন হৃদয়বিদারক অথচ সাহসী এক দলিল— “আমি বীরাঙ্গনা বলছি”—যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও নারী ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।
ড. নীলিমা ইব্রাহিম একাধারে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান, রোকেয়া হলের প্রভোস্ট এবং সংস্কৃত ও পালি বিভাগের অধ্যক্ষ।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির সভাপতি, এসোসিয়েটেড কান্ট্রি উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এর সাউথইস্ট এশিয়া অঞ্চলের এরিয়া প্রেসিডেন্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব উইমেন-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের একমাত্র নারী প্রতিনিধি হিসেবে তিনি অংশ নেন মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী কংগ্রেসে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে –“শরৎ প্রতিভা,” “বাংলার কবি মধুসূদন,” “বাংলা নাটক: উৎস ও ধারা,” “বাঙালি মানস ও বাংলা সাহিত্য,” এবং “আমি বীরাঙ্গনা বলছি।”
তাঁর আজীবনের নিরলস অবদান ও মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও স্বাধীনতা পুরস্কার।
২০০২ সালের ১৮ জুন তিনি পরলোকগমন করেন।
দেশ ও নারী মুক্তির সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক দীপ্ত ইতিহাস।
শ্রদ্ধাঞ্জলি – একাত্তরের বন্ধু, ড. নীলিমা ইব্রাহিমের প্রতি।
খবরওয়ালা/এমএজেড