খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও সুসংহত এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করার লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। এই আবেদনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জন্য পৃথক দুইজন পুলিশ কমিশনার নিয়োগের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল ২০২৬), সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এস. এম. জুলফিকার আলী জুনু জনস্বার্থে এই রিটটি দায়ের করেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, বর্তমানে রাজধানী ঢাকা প্রশাসনিকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ভাগে বিভক্ত। ২০১১ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে দুই ভাগে ভাগ করা হলেও দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও মহানগরীর পুলিশিং ব্যবস্থা এখনো ব্রিটিশ আমলের কাঠামো বা একক প্রশাসনিক বলয়ে রয়ে গেছে। বর্তমানে পুরো ডিএমপি একজন কমিশনারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যা বিশাল এই জনপদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে রিটকারী দাবি করেন।
রিট আবেদনে ডিএমপি-কে দুটি পৃথক পুলিশি ইউনিটে বিভক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলা হয়:
জনসংখ্যার চাপ: রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও দ্রুত নগরায়নের ফলে একক কমিশনারের পক্ষে পুরো এলাকা তদারকি করা জটিল হয়ে পড়েছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণ: উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ায় অপরাধের ধরণও ভিন্ন। পৃথক ইউনিট থাকলে অপরাধ দমনে বিশেষায়িত ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।
যানজট নিরসন: ঢাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা যানজট ব্যবস্থাপনায় দুই সিটির সমন্বয়ে পৃথক ট্রাফিক বিভাগ ও কমিশনার থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুততর হবে।
জবাবদিহিতা: পুলিশিং ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
এই রিট পিটিশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ডিএমপি কমিশনার, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ সংশ্লিষ্ট আটজন ব্যক্তিকে বিবাদী করা হয়েছে।
আবেদনকারী আইনজীবী আদালতের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দেশনা প্রার্থনা করেছেন:
১. ডিএমপিকে আইনগতভাবে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর পুলিশ হিসেবে দুটি পৃথক প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্ত করা।
২. দুই ইউনিটের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে পৃথক দুইজন পুলিশ কমিশনার নিয়োগের আদেশ প্রদান।
৩. বিদ্যমান একক কাঠামো যা পরিবর্তিত প্রশাসনিক বাস্তবতায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে, তাকে অসাংবিধানিক ও জনস্বার্থ বিরোধী ঘোষণা করা।
নিচে ঢাকা মহানগর পুলিশের বর্তমান সাংগঠনিক বিন্যাস এবং রিট পরবর্তী সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি তুলনামূলক ছক তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা (একক ডিএমপি) | রিট অনুযায়ী প্রস্তাবিত পরিবর্তন |
| নেতৃত্ব | একজন পুলিশ কমিশনার | দুইজন পৃথক পুলিশ কমিশনার |
| প্রশাসনিক বিভাগ | পুরো ঢাকা মহানগর একীভূত | উত্তর ও দক্ষিণ সিটির জন্য পৃথক ইউনিট |
| সমন্বয় | কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রিত | স্ব-স্ব সিটি কর্পোরেশনের সাথে সমন্বয় |
| বিভাগ সংখ্যা | ৮টি বিভাগ (যেমন- রমনা, মতিঝিল ইত্যাদি) | উত্তর ও দক্ষিণ সিটির সীমানা অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস |
| পুলিশিং মডেল | একক ও কেন্দ্রীয় পুলিশিং | বিকেন্দ্রীকৃত ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর পুলিশিং |
রিটে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, বিশ্বের অনেক বড় মেগাসিটিতে একাধিক পুলিশিং ইউনিট কার্যকর রয়েছে। ঢাকার আয়তন ও অপরাধের বিস্তৃতি বিবেচনায় একজন কমিশনারের পক্ষে মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। বর্তমান কাঠামোটি অকার্যকর হিসেবে উল্লেখ করে একে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষে রিটে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে এই রিট আবেদনটির ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আদালত প্রাথমিক শুনানি শেষে এ বিষয়ে রুল জারি করবেন কি না, তা পরবর্তী কার্যদিবসে জানা যাবে।