খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 10শে মাঘ ১৪৩২ | ২৩ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
দেশের বৃহত্তম চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও কর্মপরিবেশ বিঘ্নিত করার দায়ে তিন যুবককে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছে আদালত। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এক সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। রায় ঘোষণার পরপরই দণ্ডপ্রাপ্তদের কঠোর পুলিশি পাহারায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার ফলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও হাসপাতালের কর্মপরিবেশ নিয়ে পুনরায় আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে লাকি বেগম (৩৪) নামের এক নারীকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও রাত ১১টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। রোগীর মৃত্যুর খবর শোনার পরপরই তাঁর ছেলে রাকিব চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ‘ভুল চিকিৎসার’ ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন রাকিবের বন্ধু মো. শাকিব হোসেন আরও ২০-৩০ জন বহিরাগত যুবককে মোবাইল ফোনে হাসপাতালে ডেকে আনেন। সশস্ত্র ও উশৃঙ্খল এই যুবকের দল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে প্রবেশ করে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে তারা দুই ইন্টার্ন চিকিৎসককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করে। এতে জরুরি বিভাগের চিকিৎসা সেবা সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে এবং সাধারণ রোগীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও দণ্ডপ্রাপ্তদের তথ্য:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| ঘটনাস্থল | মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। |
| ঘটনার সময় | বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাত ১১:০০ টা। |
| দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ | মো. শাকিব হোসেন (২৫), মো. শাহরিয়া নাজিম রবিন (২১) ও ইমতিয়াজ আহাম্মেদ (২৫)। |
| শাস্তির ধরণ | দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড। |
| আদালতের নাম | ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। |
| অভিযোগের ধরণ | চিকিৎসকদের মারধর, সরকারি কাজে বাধা ও হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা। |
হামলার খবর পেয়ে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁরা শাকিবসহ তিনজনকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হলেও বাকি হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। আটককৃতদের আজ স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁদের অপরাধ আমলে নেন। ডিএমপির মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, হাসপাতালে রোগীর স্বজন বা বহিরাগতদের এমন বেপরোয়া আচরণ চিকিৎসকদের মনোবল ভেঙে দেয়। উল্লেখ্য যে, বিগত কয়েক বছরে ঢামেকে চিকিৎসকদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে মাঝেমধ্যেই কর্মবিরতি বা আন্দোলনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে প্রতিটি বিভাগে নিরাপত্তা ও সিসিটিভি নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। শোকাতুর পরিবারের আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারানো দুঃখজনক হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঢামেক হাসপাতালের এই দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের সাজা প্রদান মূলত একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জীবনদানকারী চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালানোর দুঃসাহস না দেখায়। পলাতক বাকি হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।