খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় রূপার নূপুর চুরির ভিত্তিহীন অপবাদে এক পিতৃহীন কিশোরকে দোকানঘরে আটকে রেখে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করার ঘটনায় অন্যতম প্রধান আসামি তরিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার তাকে সুনামগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন। গ্রেফতারকৃত তরিকুল উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের লাউড়গড় গ্রামের আমির উদ্দিনের ছেলে। এই মামলার প্রধান আসামি আমির উদ্দিনকেও পুলিশ আগেই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
ঘটনার নৃশংসতা ও প্রেক্ষাপট
ঘটনাটি শুরু হয় কয়েক মাস আগে, যখন প্রধান আসামি আমির উদ্দিনের শিশু কন্যার একটি রূপার নূপুর হারিয়ে যায়। চুরির সন্দেহ গিয়ে পড়ে স্থানীয় কিশোর হাফিজ উদ্দিনের ওপর, যে কি না জাদুকাটা নদীতে কয়লা ও লাকড়ি কুড়িয়ে অতি কষ্টে জীবিকা নির্বাহ করে। গত ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমির ও তার সহযোগীরা হাফিজকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে একটি দোকানঘরের ভেতর হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর শুরু হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা। নূপুর চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ে আমির ও তার দুই ছেলেসহ অভিযুক্তরা হাফিজের হাত ও পায়ের নখের ভেতর সুই ঢুকিয়ে দেয়। শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে প্লাস দিয়ে চেপে এবং দফায় দফায় মারধর করে অসহ্য যন্ত্রণা দেওয়া হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে কিশোর হাফিজ দুবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অমানবিকতার চরম সীমায় পৌঁছে দুর্বৃত্তরা তার শরীরের ক্ষতস্থানে ফ্রিজে থাকা বরফশীতল পানি ঢেলে জ্ঞান ফিরিয়ে পুনরায় নির্যাতন চালায়।
ঘটনার প্রধান তথ্যসমূহ এবং আইনি পদক্ষেপের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও তথ্য |
|---|---|
| নির্যাতিত কিশোর | হাফিজ উদ্দিন, মৃত আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে (পিতৃহীন)। |
| প্রধান অভিযুক্ত | আমির উদ্দিন ও তার দুই ছেলে (সফিকুল ও তরিকুল)। |
| নির্যাতনের ধরন | হাত-পায়ের নখে সুই ঢোকানো, প্লাস দিয়ে পেশি পেষণ। |
| ঘটনার স্থান ও সময় | লাউড়গড় সীমান্ত বাজার এলাকা, ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। |
| মামলার বাদী | আব্দুর রহমান (নির্যাতিত কিশোরের চাচা)। |
| গ্রেফতারকৃত আসামি | ১. আমির উদ্দিন, ২. তরিকুল ইসলাম। |
| বর্তমান আইনি স্থিতি | গ্রেফতারকৃতরা জেলহাজতে; পলাতক আসামিদের সন্ধানে অভিযান। |
আইনি কার্যক্রম ও পুলিশের পদক্ষেপ
এই জঘন্য ঘটনার পর গত ৩০ ডিসেম্বর নির্যাতিত কিশোরের চাচা আব্দুর রহমান বাদী হয়ে তাহিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আমির উদ্দিন, তার ছেলে সফিকুল, তরিকুল এবং হেলাল উদ্দিনের ছেলে রাকিবসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ তৎপর হয়ে প্রধান আসামি আমিরকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পলাতক আসামি তরিকুলকেও আইনের আওতায় আনা হয়। সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন জানিয়েছেন, একজন অসহায় পিতৃহীন কিশোরের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জড়িত অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম বর্তমানে মাঠে কাজ করছে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও বিচার প্রার্থনা
সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন রোমহর্ষক নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসীর দাবি, চুরির কোনো প্রমাণ ছাড়াই কেবল সন্দেহের বশে একজন কিশোরকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই মামলার নিষ্পত্তি এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। বর্তমানে ভুক্তভোগী হাফিজ উদ্দিন শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।