খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
বগুড়ার নবগঠিত কয়েকটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে নিজের বংশ ও দুই ছেলের নামে তিনটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রতিমন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেছেন যে, তাঁর সন্তানদের নাম অনুসারে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা বিবেচনায় নিয়ে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নাম দুটি রাখা হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে গণশুনানি সম্পন্ন করার পরই এই নামগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
আজ সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালে এই বিতর্কিত নামকরণের বিষয়টি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন যে, প্রতিমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকায় নবগঠিত একটি ইউনিয়নের নাম তাঁর পারিবারিক বংশের পদবি অনুসারে ‘মীরবাড়ী’ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি আরও দুটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলে দিগন্ত ও সীমান্তের নামানুসারে।
সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের নামে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা এলাকার নামকরণের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তাঁর এই ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর এলাকায় এই ঘটনা ঘটার মাধ্যমে অতীতে নাম পরিবর্তন, সংশোধন ও নতুন নামকরণের যে নেতিবাচক সংস্কৃতি চালু ছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই প্রবণতা বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় সংসদে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ছাঁটাই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে ফ্লোর নেন। তিনি বিরোধীদলীয় সদস্যের উত্থাপিত সকল অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, বগুড়ার মোকামতলা এলাকার সৈয়দপুর ও দেউলি ইউনিয়ন দুটি দীর্ঘদিন ধরে আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে অনেক বড় ছিল। প্রশাসনিক সুবিধার্থে এবং স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই ইউনিয়নগুলো বিভক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের সার্বিক যাচাই-বাছাই এবং একাধিক গণশুনানির মাধ্যমে সব পক্ষের সম্মতিক্রমে নতুন ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ভৌগোলিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, বিলুপ্ত বা পুনর্গঠিত সৈয়দপুর ইউনিয়নটি মূলত গাবতলী ও সোনাতলা উপজেলার সীমান্তবর্তী অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকায় অবস্থিত। এই সীমান্ত সংলগ্ন অবস্থানের কারণেই স্থানীয় প্রশাসন এর নাম রেখেছে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’। অন্যদিকে, গাইবান্ধা জেলার সীমানার কাছাকাছি অবস্থিত এবং জেলা সদর থেকে তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত দূরবর্তী একটি প্রান্তিক এলাকার জন্য দিগন্ত বিস্তৃত ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ নাম নির্বাচন করা হয়েছে।
মীর শাহে আলম যুক্তি প্রদর্শন করে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় সীমান্ত ও দিগন্ত শব্দ দুটি ব্যবহার করে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও ভবনের নামকরণ করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ একটি কাকতালীয় বিষয় যে, আমার দুই সন্তানের নামের সঙ্গে এই ভৌগোলিক নাম দুটির মিল রয়েছে। যদি আমার মূল উদ্দেশ্য সন্তানদের নামেই ইউনিয়নের নামকরণ করা হতো, তবে আমি নিশ্চিতভাবেই নামের শুরুতে আমাদের বংশীয় পদবি “মীর” যুক্ত করার জন্য লিখিত প্রস্তাব দিতাম। কিন্তু এই নতুন দুই ইউনিয়নের নামের আগে বা পরে কোনো প্রকার “মীর” শব্দের উল্লেখ নেই।’
নিজের বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী সংসদে কিছুটা রসিকতার সুর এনে বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন যে, মাননীয় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম সাহেব দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) মালিকানাধীন “সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড” আমার ব্যাংক বলে দাবি করেননি, কিংবা রেলওয়ের “সীমান্ত এক্সপ্রেস” আমার ব্যক্তিগত ট্রেন হিসেবে উল্লেখ করেননি। একইভাবে ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান-১–এ অবস্থিত “দিগন্ত টাওয়ার” নামক বহুতল ভবনটিও যে আমার বা আমার পরিবারের নয়, সেটাও তিনি সদয় হয়ে সংসদে বলেননি।’ প্রতিমন্ত্রীর এই যুক্তিপূর্ণ ও রসাত্মক বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সংসদের সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁর বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও সাধুবাদ জানান।
সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা এবং প্রশাসনিকভাবে নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় নতুন চারটি ইউনিয়ন গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। গত ১১ জুন বগুড়ার জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি এবং মোকামতলা উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রশাসনিক সীমানা পুনর্গঠন করা হয়। গতকাল রোববার এই প্রজ্ঞাপনটির সরকারি গেজেট বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই নতুন গঠিত ইউনিয়নগুলোর নামকরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সূত্রপাত হয়।
নতুন এই প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী, শিবগঞ্জ উপজেলায় ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’ এবং নতুন মোকামতলা উপজেলায় ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’ নামে তিনটি পৃথক ইউনিয়নসহ মোট চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। এই চারটির মধ্যে ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’—এই তিনটি নাম প্রতিমন্ত্রীর পরিবার ও বংশের সাথে মিলে যাওয়ার কারণেই মূলত রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা আজ জাতীয় সংসদের ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় স্থান পায়।