রাসেল রায়হান
প্রকাশ: রবিবার, ৩০ মার্চ ২০২৫
এক দিন এগিয়ে থাকা লোকটি
জন্ম থেকে ভিতু আমি, তাই কত কিছু বলা হয়নি তোমাকে। আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রুফরিডিংয়ের কাজ করি। বাবা একজনের ঘড়ি চুরি করে পরীক্ষার ফিস দিয়েছিলেন, সেই গল্প আমি জানি—তখন থেকেই আমার এত ভয়। আর এত দূর থেকে বলাটা ঠিক ভালোও দেখায় না। তুমি অত দূরে থাকো যে আসতে পারো না, তোমার ঘ্রাণ আসে শুধু। অহমে উড়ন্ত একটি বিমান যেমন পাতালের ছুটন্ত খরগোশটিকে ক্ষুদ্র ভাবে, জানে না, খরগোশটির চোখেও সে ক্ষুদ্রতর; তেমনই টের পাই, তুমিও ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছ আর ক্ষুদ্রতর হচ্ছ, কাঁটাতারের ওপাশে।
ওপাশের আজান শুনে বুঝতে পারি, প্রার্থনার সময় হয়েছে। নতুন ভবন উঠছে ওপাশে, শুনেছি নতুন সরকারি অফিস হচ্ছে, সেখানে কারা জানি থালা পিটিয়ে রোজ লালনের গান গায়। আমি ভাবি, যদি এমন একটি গান আমার হয়ে কেউ লিখত, আমিও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গাইতাম।
তোমাকে যা বলতে চাই, তা মোটামুটি এ রকম: ‘কেউ কেউ এমন থাকবেই, উৎসবের ভোরে তোমায় কল্পনা করে করে চকচকে মোরগের গলায় চালাবে নিরীহ ছুরি। নিরুপদ্রব জীবন আমার আর ভালো লাগবে না। ময়দানে হেরে যাওয়া ঘোড়াটির খুরের আঘাতে মৃত্যু কামনা করব তখন। মৃত্যু কামনা করব তোমার নম্র চুমুতে।’
এতটা কঠিন কথা বলা হয়তো ঠিক হবে না। বরং অন্য কিছু বলা যাক: ‘চোখের সামনে খোলো ত্রস্ত করতল, কোনো এক ম্যাজিকে আয়ু হাজার বছর করে দিই তোমার।’
নিদেনপক্ষে বলব: ‘ভালোবাসি, মৌরিতান।’
একেক দিন তুমি ঘুরতে আসো—কাঁটাতারের ওপাশে—না-দেখার ভান করে দেখি, না-শোনার ভান করে শুনি, টের পেতে না দিয়ে ঘ্রাণ নিই, কাঁদি—কোনো এক ব্যর্থ ব্যাধ একটি পাখির জন্য এভাবে কেঁদেছিল। তুমি তখন সূর্য আড়াল করে দাঁড়াও। শাড়ি উড়তে থাকে। বিস্ফোরণের মতো ফুটতে থাকে দু-একটি বোগেনভেলিয়া। আমার জানালার পাশে একটি কাঠবিড়ালির ত্রস্ত আস্ফালনে পায়ের কাছে ঝরে পড়ে এক-দুটি বাদাম। মনে পড়ে, এভাবেই ইসরায়েল বোমা ফেলছে ফিলিস্তিনে, সৌদি মেরে ফেলেছে ইয়েমেনের ত্রিশজন শিশু। শুনেছি, তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, ওখান থেকেও মাঝে মাঝে গুলি ছুটে আসে। তারপর ব্যক্তিগত কম্পিউটার থেকে মুছে যায় একেকটি ফাইল। ফেসবুকের বন্ধুতালিকা থেকে কেটে যেতে থাকে একেকজন। নতুন নতুন নাম মুছে যায় ইরেজারে। সবাই বলাবলি করে, তোমরা ইরেজার খুব ভালো বানাও। আমরা বানাই পেনসিল।
আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রুফরিডারের চাকরি করি। আমার কাছে আজ মানে গতকাল। এক দিন এগিয়ে থাকি। যেমন ঠিক সোমবার অফিসের ঘিঞ্জি রুমে বসে লিখতে হয়, ‘গতকাল সোমবার’। লক্ষ করে দেখি, যেদিন তুমি আসো, মূলত সেটা তার আগের দিন। চাকরির শুরুর দিকে বিষয়টিকে আমার মিথ মনে হতো। এক দিন এগিয়ে থাকা একটি মানুষের আকুতি কি কেউ বুঝতে পারবে আদৌ? এসব ভেবেও ঠিক বলা হয়ে ওঠে না।
সমূহ সঞ্চয় ভেঙে একদিন একটি বাচ্চা পাখি কিনি—আফ্রিকান গ্রে। ছোলা কচলে খাওয়াই, কথা শেখাই। সেসব কথা—যা তোমাকে বলতে চেয়েছি। ভাবি, অন্তত কেউ একজন কথাগুলো শুনুক। বাচ্চা পাখিটি মনোযোগ দিয়ে শোনে। আর একদিন শিখেও ফেলে: ‘ভালোবাসি, মৌরিতান…মৃত্যু কামনা করব তোমার নম্র চুমুতে…আয়ু হাজার বছর করে দিই তোমার…।’
ধীরে আসে মঙ্গলবার, আমার কাছে যেটি মূলত বুধবার। অফিস থেকে বিকেলে ফিরে আসি। আর খাঁচার কাছে গিয়ে দেখি দরজা খোলা, পাখি নেই। কাঠবাদামগাছ থেকে চিৎকার আসে: ‘ভালোবাসি, মৌরিতান।’ ছুটে যাই বাইরে। প্রথমেই চোখ পড়ে কাঠবিড়ালির ওপর—অল্প দূর থেকে পাখিটিকে দেখছে। তারপর এগোতে থাকে সেদিকে। আফ্রিকান গ্রে উড়ে যায় ওপাশে। কাঁটাতারের দিকে। পার হয়ে শহরে—তোমার শহরে। তখনো শুনতে পাই চিৎকার—শহরে শহরে উড়ে বেড়াচ্ছে, ‘ভালোবাসি, মৌরিতান…আয়ু হাজার বছর করে দিই…ভালোবাসি, মৌরিতান…।’
জন্ম থেকে ভিতু আমি, বলা হয়ে ওঠে না তোমাকে কিছু। তবু শান্তি, ওপাশে শহরময় চিরন্তন সংগীতের মতো ঘুরে বেড়াবে আমার কথাগুলো—সুতীক্ষ্ণ বল্লমের মতো যা একদিন ঠিক বিঁধবে তোমার বুকে।