খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের পাঁচটি জেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৪টি জেলাকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সামাজিক প্ল্যাটফর্ম ‘সম্প্রীতি যাত্রা’। শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এর সাগর–রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ প্রতিনিধিরা।
উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলো হলো ঢাকা, রংপুর, যশোর, চাঁদপুর ও নোয়াখালী। মানচিত্র অনুযায়ী, মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে গাজীপুর, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, কুষ্টিয়া, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী ও নেত্রকোনা। দেশের অন্যান্য জেলাকে নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘সম্প্রীতি যাত্রা’ জানিয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার প্রতিবেদনে প্রকাশিত পূজা ও অন্যান্য সময়ে পূজামণ্ডপ, শোভাযাত্রার রুট বা সংখ্যালঘু বাড়িঘরে হামলার ঘটনা বিশ্লেষণ করে তারা এই ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করেছে।
সংগঠনের উদ্যোগে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ প্ল্যাটফর্মটি বিভিন্ন লেখক, সাহিত্যিক, কবি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সহযোগিতায় গঠিত হয়েছে। শিগগিরই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কমিটি গঠন করা হবে, যারা মন্দির, মাজার, ধর্মীয় স্থাপনা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ করবে।
সংস্কৃতিক কর্মী বিথী ঘোষের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন লেখক ও গবেষক মীর হুযাইফা আল মামদূহ। তিনি বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটি দেখার কথা। কিন্তু নানা অভিযোগে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে সম্প্রীতি বিনষ্টের অপতৎপরতা চলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের পরও এই প্রবণতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি।’
ধর্মীয় স্বাধীনতা দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার উল্লেখ করে মীর হুযাইফা আল মামদূহ বলেন, ‘ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যদি আগাম প্রস্তুতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণ একত্র করা যায়, তবে মন্দির, মাজার, আখড়া এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।’
সংবাদ সম্মেলনে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ স্থানীয় কমিটি গঠন, মনিটরিং ও নথিভুক্তি, গুজব প্রতিরোধ, দ্রুত সহায়তা কাঠামো এবং প্রতিবেদন ও নীতি প্রস্তাবের মতো পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন।
আয়োজকেরা জানান, এই প্ল্যাটফর্ম কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠিত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের উদ্দেশ্যে কাজ করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যক্রম শুরু হয়।
মন্দির, মাজার, আখড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ সরকারের কাছে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন, দ্রুত রেসপন্স টিম, গুজব প্রতিরোধ কাঠামো, অভিযোগ গ্রহণে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও জরুরি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক মাহা মির্জা বলেন, ‘যে ঘটনাগুলো আমরা বলছি, তা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আমরা মনে করি, সরকার চাইলে মব থামানো সম্ভব। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এই অপরাধগুলোতে পুরোপুরি চোখ বন্ধ করে আছে।’
মাহা মির্জা আরও বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ছিল সহমর্মিতার বাংলাদেশ, যেখানে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ মিলেমিশে থাকবে। কিন্তু বর্তমানে আমরা যে বাংলাদেশ দেখছি, সেটা ভীতিকর এবং সরকারের আচরণে আমরা ক্ষুব্ধ।’
সংবাদ সম্মেলনে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভ্রান্তি রোধে ফ্যাক্টচেকিং দল গঠন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর স্থানীয় নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন, সংখ্যালঘু সংগঠন, সুফি ও মাজারভিত্তিক সংগঠন, বাউল ও ফকির সম্প্রদায়, আদিবাসী, নারী, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চিন্তক ও শিল্পী অরূপ রাহী, লেখক ফেরদৌস আরা রুমী, লেখক বাকি বিল্লাহ এবং সাংবাদিক রহমান মুফিজ।
খবরওয়ালা/শরিফ