খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এএবি) কর্তৃক সরবরাহ করা লাইসেন্স ভুয়া বলে ধরা হচ্ছে; তবে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি।
তথ্য অনুযায়ী, এএবি আন্তর্জাতিক সংস্থা ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল ডি ল অটোমোবাইলের (এফআইএ) একমাত্র সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট সরবরাহ করে। এফআইএর নিয়ম অনুসারে এসব লাইসেন্সকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অনুমোদন করতে হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন থেকে এএবি যে লাইসেন্স দিয়েছে, তার কোনোটি অনুমোদিত হয়নি।
একটি লাইসেন্স ইস্যু করে আগে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নিত এএবি। এর মধ্যে ২১৮ টাকা বিআরটিএকে কর হিসেবে দেওয়া হতো। গত বছরের জুন থেকে এ কর দেওয়া বন্ধ রেখেছে তারা। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহ করেছে এএবি, যা অনুমোদন না থাকায় অবৈধ হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের মার্চে বিআরটিএ চালান ও কাউন্টার সাইন বন্ধ করার পর এএবি লাইসেন্সের বই পরিবর্তন করে। যেমন ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট শ্রাবণী বড়ুয়ার লাইসেন্সে সরকারের অনুমোদিত সিল ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই মো. মোজাহিদুল হক চৌধুরীর লাইসেন্সে সে ধরনের সত্যায়ন আর দেখা যায়নি, শুধু বাংলাদেশের নাম, পতাকা ও শাপলার প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে।
বিআরটিএ জানিয়েছে, এখন এএবির দেওয়া লাইসেন্সের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাদের তথ্যভান্ডারে এ সংক্রান্ত কোনো ডেটা নেই। তাই সরকারি ওয়েবসাইটেও এসব লাইসেন্সের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইতে এএবিকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘আলোচনার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। আইনি পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে।’
১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্বাক্ষরিত প্রতিটি দেশ আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট দিতে পারবে এবং তা দিয়ে অন্য দেশে গাড়ি চালানো যাবে। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে এতে যোগ দেয়। প্রথমে পুলিশ অনুমোদন দিত, পরে বিআরটিএ এ দায়িত্ব নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে এএবি বিআরটিএর অনুমোদন আর নেয়নি।
বিআরটিএর এক কর্মকর্তা জানান, এতদিন এএবি বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কাজ চালিয়েছে। ট্যাক্স দেওয়া অব্যাহত থাকায় তা নজরে আসেনি। কিন্তু এখন ট্যাক্সও দিচ্ছে না এবং বিআরটিএর নামও ব্যবহার করছে না।
গত ১০ এপ্রিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বৈঠকে এএবির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল বিআরটিএ চিঠি দিয়ে জানতে চায়, কোন প্রক্রিয়ায় তারা লাইসেন্স দিচ্ছে এবং কেন ফি বাড়িয়েছে। আগে সাধারণ ফি ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭০০। দ্রুত পেতে হলে ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে তা বেড়ে তিন ধাপে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭০০ টাকা। ছয় মাস কেটে গেলেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন বলেন, ‘এই লাইসেন্স নিয়ে বিদেশে গিয়ে আবার লাইসেন্স করতে হয়। তাই কার্যত কোনো মূল্য নেই। অনেক চালক প্রতারিত হয়েছেন।’
এএবির প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা মামুন আহামেদ মারুফ বলেন, ‘দশ বছর ধরে ফি বাড়ানো হয়নি, তাই বাড়ানো হয়েছে। ডলার বাড়ায় খরচও বেড়েছে। নকল ঠেকাতে বইয়ের ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। আমরা এফআইএর সঙ্গেই আলোচনা করেছি।’ তিনি দাবি করেন, ‘বিআরটিএর সত্যায়ন এখন প্রয়োজন নেই। যাদের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে, তাদের আমরা আন্তর্জাতিক পারমিট দিতে পারি।’
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিটে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক বলেন, ‘বিআরটিএ কেন নিজে আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট দিতে পারে না, সেটা প্রশ্ন। জাতিসংঘ পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে দিয়েছে। বিদেশি লাইসেন্সে দেশে গাড়ি চালানো যায়, তাহলে আমাদের লাইসেন্স দিয়ে অন্য দেশে কেন চালানো যাবে না? সরকারি প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা কেন তৈরি হলো না, সেটা ভাবার বিষয়।’
খবরওয়ালা/টিএসএন