খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
মরণঘাতী ইয়াবার পর বাংলাদেশে নতুন নতুন মাদকদ্রব্যের বিস্তার ঘটছে, এবং মাদক ব্যবসায় মাফিয়াদের প্রভাব বাড়ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)-এর সূত্র অনুযায়ী, মাদক মাফিয়ারা এই ভয়ানক ব্যবসায় তরুণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে।
নতুন আবিষ্কৃত মাদকগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘এমডিএমএ’, যা ‘মেথালাইন ডি-অক্সি মেথ-অ্যাম্ফিটামিন’ নামে পরিচিত।
ডিএনসি সম্প্রতি এই নতুন মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ পাঁচজনকে আটকের কথা জানিয়েছে।
ডিএনসি সূত্র আরও জানায়, তাদের কাছে ৮৫ জন মূল হোতাসহ ১,২৩০ জন মাদক ব্যবসায়ীর একটি পুরোনো তালিকা আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশ দিলেও গতকাল বুধবার পর্যন্ত তা করা হয়নি। বেশিরভাগ শীর্ষ মাদক মাফিয়া এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ডিএনসি’র ভাষ্যমতে, মাদক চক্র তাদের ব্যবসায় বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাজে লাগাচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের আনাচে-কানাচে এমনকি গ্রাম পর্যন্ত এখন সহজেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে।
অনলাইনেও মাদকের রমরমা কারবার চলছে। মাদকের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় প্রতি বছর দেশ থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে।
বেসরকারি সংস্থা মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রধান ডা. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে দেশে প্রায় দেড় কোটি মাদকাসক্ত রয়েছে।’
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন যে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শুধু মাদক সেবনই নয়, কেনাবেচাতেও জড়িয়ে পড়ছে। এই শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
সাম্প্রতিক তদন্তের ভিত্তিতে ডিএনসি ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, অনেক তরুণ এখন আড্ডার প্রধান উপকরণ হিসেবে মাদককে বেছে নিয়েছে। এই চক্রের হাজারেরও বেশি সদস্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে, যা যাচাই করা হচ্ছে।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এই চক্র একটি আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসার অংশ এবং তারা দেশে একটি বড় মাদকের বাজার তৈরির চেষ্টা করছে। তারা ইতিমধ্যেই হেরোইন, আইস, কুশসহ কয়েকটি মাদকে তরুণদের একটি অংশকে আসক্ত করতে পেরেছে এবং এখন মাদক কেনাবেচার জন্য বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা শুরু করেছে।
ডিএনসি’র মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ‘সম্প্রতি আটক হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের সদস্য। তারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আরও অনেক শিক্ষার্থী এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। চক্রটি ঢাকার ডিজে পার্টি এবং বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় মাদক সরবরাহ করে থাকে।’
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে ডাকযোগে আসা এমডিএমএ’র একটি চালানসহ এই চক্রের একজনকে প্রথমে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৩১৭টি এমডিএমএ ট্যাবলেট, গাঁজা এবং কিটামিন জব্দ করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘মাদক বর্তমানে সমাজের একটি বড় সমস্যা। সীমান্ত দিয়ে দেশে মাদক ঢুকছে। মাদকসহ ধরা পড়া ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ছে, যা থেকে বোঝা যায় যে মাদক বেশি আসছে এবং ধরাও পড়ছে।’
ডিএনসি সূত্রমতে, আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র বাংলাদেশকে মাদকের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। গত এক মাসের মধ্যে নতুন মাদক এমডিএমএ, কিটামিন এবং কোকেনের চালান ধরা পড়েছে। এতে জড়িত থাকার অভিযোগে একজন বিদেশি নারী মাদক ব্যবসায়ীকেও আটক করা হয়েছে। প্রতিদিন ৫০ লাখের বেশি ইয়াবার চালান দেশে ঢুকছে।
উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে কিটামিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে ডিএনসি জানিয়েছে, কিটামিন মূলত একটি ‘ডিসোসিয়েটিভ অ্যানেসথেটিক’ ওষুধ, যা চিকিৎসায় অপারেশনের সময় অজ্ঞান করতে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে মাদক হিসেবে এর অপব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র অনুযায়ী, প্রতি বছর জব্দ করা মাদকের তালিকায় ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের পরিমাণ বাড়ছে। মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫৪,৮৮৪ পিস ইয়াবা কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এছাড়া ক্রিস্টাল মেথ (আইস), হেরোইন, কোকেন, গাঁজা, আফিম, বিদেশি মদ এবং ফেনসিডিলের মতো মাদকও ঢুকছে।
কিটামিন নিয়ে চক্রের নতুন কৌশল: ডিএনসি জানিয়েছে, গত ৭ সেপ্টেম্বর টঙ্গী এলাকা থেকে কিটামিনসহ আন্তর্জাতিক চক্রের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএনসি’র মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মাদকচক্র কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে পাচার চালাচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হিসেবে টঙ্গীর একটি কুরিয়ার সার্ভিসে অভিযান চালিয়ে ঢাকা থেকে ইতালিগামী একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। পরে তোয়ালের ভেতর দ্রবীভূত অবস্থায় ৬.৪৪ কেজি কিটামিন শনাক্ত করা হয়। জব্দকৃত পার্সেলের প্রেরকের ঠিকানা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে চাঁদপুরের মতলব উত্তর এলাকা থেকে প্রেরক মো. মাসুদুর রহমান জিলানীকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
নতুন মাদক কেনাবেচায় জড়িত শিক্ষার্থীরা: সম্প্রতি এমডিএমএ বিক্রির অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। তাদের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৈয়দ শাইয়ান আহমেদ ও আসিফ মাহবুব চৌধুরী রয়েছে। অন্য তিনজন হলো মো. জুবায়ের, জি এম প্রথিত সামস এবং অপূর্ব রায়। এদের মধ্যে প্রথিত সামস ও অপূর্ব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ডিএনসিকে জানিয়েছে, আর্থিক লাভের বিনিময়ে তারা মাদক কেনাবেচায় যুক্ত হয়েছিল।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ডিএনসি কর্মকর্তারা বলেন, জুবায়ের জানিয়েছে, প্রথিত সামসের কাছে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এর জন্য সে অগ্রিম হিসেবে তিন ধাপে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা পেয়েছে।
ডিএনসি সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জুবায়ের বলেছে যে পার্সেলটি যুক্তরাজ্য থেকে অরণ্য নামে একজন ডাকযোগে পাঠিয়েছে। এটি পাঠানো হয়েছে অরণ্যের বন্ধু অপূর্ব রায়ের নাম, ঠিকানা এবং মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পার্সেলটি গ্রহণ করে অরণ্যের আরেক বন্ধু জি এম প্রথিত সামসের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল।
এভাবে সম্প্রতি ডিএনসি দেশে বেশ কয়েকটি মাদকের চালান জব্দ করার কথা জানিয়েছে। গত ২৬ আগস্ট দিবাগত রাতে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা আট কেজির বেশি কোকেনসহ গায়ানার নাগরিক এম এস ক্যারেন ‘পেটুলা স্টাফলি’ নামে এক নারীকে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর গ্রেপ্তার করে।
গত ২৫ আগস্ট আদাবর থানাধীন বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটির একটি বাসা থেকে মো. খাইরুল ইসলাম ওরফে রিয়ান নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে চার হাজার পিস অ্যাম্ফিটামিনযুক্ত ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ‘অস্ট্রেলিয়া’ থেকে আসা কুশ এবং এক কেজি ৬০০ গ্রাম আইসসহ বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
মাদকের টাকার ভাগ নিয়ে খুনোখুনি: খুচরা মাদক বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীর কালশী আদর্শনগর এলাকায় বাসায় ঢুকে সন্ত্রাসীরা এক ভাইকে গুলি করে এবং তার বোনকে ছুরিকাঘাত করে। আহতরা হলেন লাভলী বেগম ও তার ভাই সুমন মিয়া। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, তারা মাদকচক্রের সদস্য।
এছাড়াও, মাদক ব্যবসার বিরোধের জেরে সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় নারী ও শিশুসহ অন্তত নয়জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে।
খবরওয়ালা/টিএসএন