খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 16শে আষাঢ় ১৪৩২ | ৩০ই জুন ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
কুমিল্লার মুরাদনগরে আলোচিত ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি ফজর আলীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে একধরনের ‘ঠেলাঠেলি’ শুরু হয়েছে। কেউ তাঁকে আওয়ামী লীগের লোক বলছেন, কেউ বা বিএনপির কর্মী দাবি করছেন। তবে কোনো দলেই তাঁর পদ-পদবি থাকার তথ্য মেলেনি। এলাকায় সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত এই ফজর আলীর দুই দলের নানা কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
নাগরিক সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। তাঁরা মনে করেন, ফজর আলীর দলীয় পরিচয় নিয়ে যে ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ।
গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মুরাদনগর উপজেলার একটি গ্রামে বসতঘরের দরজা ভেঙে ২৫ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ফজর আলীর বিরুদ্ধে। এ সময় আশপাশের লোকজন এসে তাঁকে মারধর করেন। একই সঙ্গে কয়েকজন যুবক ওই নারীকেও বিবস্ত্র অবস্থায় পিটিয়ে আহত করেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এ ঘটনায় ধর্ষণ ও নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দুটি মামলা হয়েছে। পুলিশ ফজর আলীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হাত-পা ভাঙার কারণে ফজর আলী বর্তমানে পুলিশ পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ফজর আলীর কোনো রাজনৈতিক দলীয় পদ নেই। তবে এলাকাবাসীর দাবি, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ফজর আলী নিজেকে আওয়ামী লীগের লোক বলে পরিচয় দিতেন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নিতেন। এরপরে তিনি নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে তুলে ধরেন এবং বিএনপির অনুষ্ঠানেও যোগ দেন। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ফজর আলীও ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা ফজর আলীকে ‘সুবিধাবাদী দলের’ লোক হিসেবেই জানেন। মাদক ব্যবসা ও জুয়ার আসর বসানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক কারবার, জুয়া চালানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ বলেও অনেকে জানান।
এ প্রসঙ্গে জানতে ইউপি চেয়ারম্যানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি প্রথমে একটি সভায় রয়েছেন বলে জানান। পরে বেলা একটা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ধরনেনি।
একজন সাবেক ইউপি সদস্য বলেন, ফজর আলী আগে আওয়ামী লীগের ছায়ায় থেকে মাদক ও জুয়াসহ নানা অপরাধমূলক কাজ করেছেন। ৫ আগস্টের পর নিজেকে বিএনপির লোক হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং বর্তমানে তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গেই চলাফেরা করতেন। তিনি বলেন, ‘ফজরের কাজই হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপকর্ম চালানো।’ তিনি আরও বলেন, ফজরের সঙ্গে তাঁর ভাই শাহ পরানের বিরোধ রয়েছে। ওই দিন রাতে যেসব পোলাপান এসে তাঁকে পিটিয়েছে, তাঁর ভাই ইন্ধন দিয়েই ওই সব পোলাপানকে এখানে পাঠিয়েছেন।
এ ঘটনায় একটি পক্ষ ফজর আলীকে বিএনপি কর্মী বলে প্রচার চালালেও বিএনপির মিডিয়া সেল ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দাবি করেছে, ফজর আলী একজন আওয়ামী লীগ নেতা এবং তাঁকে বিএনপির কর্মী হিসেবে প্রচার চালানো বিভ্রান্তিকর।
রবিবার কুমিল্লা শহরের একটি পার্টি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে মুরাদনগর উপজেলা বিএনপি দাবি করে, ‘আওয়ামী লীগ কর্মী ফজর আলীকে বিএনপির কর্মী বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
বিএনপির কর্মসূচিতে ফজরের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন অঞ্জন বলেন, ৫ আগস্টের পর অনেকে বিএনপিতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। কেউ নিজেকে বিএনপির লোক দাবি করলেই সে বিএনপির কর্মী হয়ে যায় না। ফজরের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই।
আত্মগোপনে থাকায় ফজর আলীকে নিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের কোনো নেতার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে রোববার তাঁকে নিয়ে আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়, ‘১০ মাস ধরে নিজ এলাকায় সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফজর আলী। বিএনপি সমর্থিত দলবল নিয়ে প্রায়ই এলাকায় মোরাল পুলিশিং অপারেশন চালায় ফজর আলী। উক্ত ওয়ার্ডের বিএনপি সেক্রেটারি ক্যান্ডিডেট ফজর আলী…।’
সচেতন নাগরিক কমিটির কুমিল্লা সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। তিনি বলেন, ‘ধর্ষণের মতো ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিচয়ের নোংরা প্রতিযোগিতা চলা অস্বাস্থ্যকর প্রবণতা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’
নারীনেত্রী দিলনাশি মোহসেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর দায় ঠেলাঠেলির সুযোগ নিয়ে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায়। তাঁর মতে, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে সামাজিকভাবে বয়কট করাও জরুরি।
মুরাদনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ কে এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের কাছে অপরাধীর পরিচয় শুধুই অপরাধী। আমরা কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, অপরাধের ভিত্তিতেই বিবেচনা করি।’
শুরু থেকেই অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, এরই মধ্যে মূল হোতাসহ ওই নারীকে নির্যাতন করে যারা ভিডিও ছড়িয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশবিক নির্যাতনের পরে নির্যাতন ও ভিডিও ছড়ানোর ঘটনায় আরও যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
খবরওয়ালা/এন