খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: 23শে শ্রাবণ ১৪৩২ | ৭ই আগস্ট ২০২৫ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় দেশের সবচেয়ে বড় ওষুধ মার্কেট অবস্থিত। এখান থেকেই সারাদেশে পাইকারি ওষুধ সরবরাহ হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ মার্কেটের অর্ধশতাধিক ব্যক্তি মিলে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে, যারা নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করে আসছে। একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এই সিন্ডিকেট শুধু সাধারণ ব্যবসায়ীদের নয়, রোগীদেরও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের সামিল।
জীবন বাঁচানোর ওষুধই এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুর ফাঁদে। ভেজাল ও নকল ওষুধ সেবনের ফলে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষ কিডনি বিকল, ক্যানসারসহ নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এই ওষুধগুলোই দেশে অকাল মৃত্যুর হার বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ। কারও ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক, আবার কারও ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে শরীরে দেখা দিচ্ছে ভয়ংকর বিপর্যয়।
দায়িত্বশীল অনেকে মনে করেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাবকে ভেজাল ওষুধবিরোধী অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া উচিত। তবে ওষুধ প্রশাসন দাবি করছে, মাঠপর্যায়ে তাদের অভিযান চলমান রয়েছে। যদিও বাস্তবে বড় কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না বলে জানান ওষুধ ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর এক ব্যবসায়ী জানান, মিটফোর্ড মার্কেটে তার দুটি দোকান ছিল। দীর্ঘ ২০ বছর ব্যবসা করলেও তিনি নকল ওষুধ বিক্রিতে সম্মত হননি। কিন্তু সমিতির চাপে তিনি ব্যবসা গুটিয়ে ধানমন্ডিতে চলে যান। তার ভাষ্য, সমিতির কিছু নেতা নিজেরাই নকল ওষুধ বিক্রিতে জড়িত এবং নিয়মিত মাসোহারা আদায় করেন। বিশেষ করে ইনসুলিন ও অ্যান্টিবায়োটিকসহ প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর নকল তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
মোবাইল কোর্ট বহুবার অভিযান চালিয়ে ভেজাল ওষুধ জব্দ করলেও তা বন্ধ হয়নি। বরং গ্রামাঞ্চলে এসব ওষুধ বেশি ছড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিদেশি নামিদামি কোম্পানির ওষুধের নকলই বেশি হচ্ছে, যেখানে কিছু অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
ভেজাল ওষুধে মৃত্যুর ইতিহাসও নতুন নয়। আশির দশকে নিম্নমানের প্যারাসিটামল সিরাপে ২ হাজারের বেশি শিশু মারা যায়। এরপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়নি। আজও প্রতিদিন কত মানুষ যে এই বিষাক্ত ওষুধ খেয়ে মারা যাচ্ছেন, তার হিসাব নেই কারও কাছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর নজরদারি ও দৃশ্যমান শাস্তি ছাড়া এই চক্র নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, নকল ওষুধ কিডনি বিকলের অন্যতম কারণ। তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করেন।
শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. শফি আহমেদ মোয়াজ জানান, কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া ভেজাল ওষুধ রোধ সম্ভব নয়। ক্যানসার চিকিৎসক, ডা. আয়েশা বেগম, ডা. এমএন হুদা সবাই ভেজাল ওষুধের ভয়াবহতা তুলে ধরে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কামনা করেন।
ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনায় একসময় পরিচিত সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলাহ বলেন, নকল ও ভেজাল ওষুধসামগ্রী জব্দ করার পর উপস্থিত পরীক্ষা করে সঙ্গে সঙ্গেই শাস্তির ব্যবস্থা নিতে পারলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
খবরওয়ালা/টিএসএন