গত ৬ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বৈশ্বিক বীমা খাত একদিকে যেমন নতুন পণ্য উদ্ভাবনের মাধ্যমে গ্রাহকসেবায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে পুনর্বীমা বাজার, প্রযুক্তি ও মূলধন কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছে। এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহে স্বাস্থ্য বীমা, সাইবার সুরক্ষা, অবসর-পরবর্তী আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–ভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রুডেনশিয়াল একটি নতুন ‘ইন্টিগ্রেটেড শিল্ড প্ল্যান’ (IP)–এর পরিপূরক পরিকল্পনা চালু করেছে, যা তুলনামূলক কম প্রিমিয়ামে উন্নত চিকিৎসা সুরক্ষা প্রদান করবে। নতুন তিনটি ‘রাইডার’ বা অতিরিক্ত সুবিধা সংবলিত পরিকল্পনা আগের তুলনায় গড়ে অন্তত ৩০ শতাংশ সাশ্রয়ী, যা সব বয়স ও বিভিন্ন পরিকল্পনার গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় এই উদ্যোগকে বাজারে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, হংকংভিত্তিক সিটিএফ লাইফ এবং হংকং মর্টগেজ কর্পোরেশন যৌথভাবে অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। “পলিসি রিভার্স মর্টগেজ প্রোগ্রাম” (PRMP) এবং “রিভার্স মর্টগেজ প্রোগ্রাম” (RMP)–এর মাধ্যমে গ্রাহকরা তাদের বীমা পলিসিকে সম্পদে রূপান্তর করে অবসর জীবনে নিয়মিত আয় নিশ্চিত করতে পারবেন। এতে বীমা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।
ডিজিটাল ঝুঁকি মোকাবিলায় সিঙ্গাপুরের অ্যালিয়াঞ্জ ইন্স্যুরেন্স ‘সাইবার৩৬০ প্রোটেক্ট’ নামে একটি নতুন ডিজিটাল লাইফস্টাইল সুরক্ষা পরিকল্পনা চালু করেছে। এতে ফিশিং, স্মিশিং বা চুরি হওয়া পেমেন্ট কার্ডের মাধ্যমে সংঘটিত প্রতারণাজনিত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অনলাইন লেনদেন ও ই-কমার্স নির্ভরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সাইবার সুরক্ষা বীমা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পুনর্বীমা বাজারেও পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ এপ্রিলের নবায়ন চক্রে দেখা গেছে, সম্পদ-ভিত্তিক বিপর্যয় ঝুঁকির প্রিমিয়াম হার ধীরে ধীরে কমছে এবং তা আবার ২০২০-এর শুরুর দিকের স্তরে ফিরে যাচ্ছে। বিশেষ করে জাপানে বিপর্যয়জনিত ক্ষতির অতিরিক্ত সুরক্ষা (catastrophe excess-of-loss) প্রোগ্রামে ঝুঁকি-সমন্বিত মূল্য সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ।
একই সঙ্গে ফিচ রেটিংসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের প্রধান দেশীয় বীমা কোম্পানিগুলো নতুন অর্থনৈতিক মূল্যভিত্তিক মূলধন কাঠামো (J-ICS)–এর অধীনে শক্তিশালী সলভেন্সি অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হবে। যদিও এই কাঠামোকে তুলনামূলক রক্ষণশীল বলা হচ্ছে, কারণ এতে উচ্চমাত্রার ‘ম্যাস ল্যাপস’ ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যা ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভারতের গুজরাট ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স টেক-সিটি (GIFT City)–তেও বীমা ও পুনর্বীমা খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২০ সালে যেখানে বাজারের আকার ছিল প্রায় ১০২ মিলিয়ন ডলার, তা ২০২৫ সালে বেড়ে ১.২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে—মাত্র পাঁচ বছরে ১১ গুণের বেশি প্রবৃদ্ধি।
নিচে GIFT City–এর প্রবৃদ্ধির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| বছর |
বাজারের আকার (মার্কিন ডলার) |
প্রবৃদ্ধি |
| ২০২০ |
১০২ মিলিয়ন |
— |
| ২০২৫ |
১.২ বিলিয়ন+ |
১১ গুণ+ |
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিষেবা কেন্দ্র (IFSC)–এ কার্যরত বীমা ও পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–ভিত্তিক উদ্ভাবন এখন বীমা খাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। সিবি ইনসাইটসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সাল হবে এমন একটি সময়, যখন পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়, বরং বাস্তবায়নযোগ্য ও ফলপ্রসূ প্রযুক্তিই সফলতার মূল নির্ধারক হবে। অ্যাভিভা, চাব ও মেটলাইফের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্বভাবে এআই সক্ষমতা গড়ে তুলছে, যা ইনসুরটেক স্টার্টআপগুলোর ওপর প্রতিযোগিতামূলক চাপ বাড়াচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক বীমা খাত এখন একদিকে যেমন পণ্য ও সেবায় বৈচিত্র্য আনছে, অন্যদিকে প্রযুক্তি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো ভবিষ্যতে গ্রাহকসেবা, বাজার কাঠামো ও প্রতিযোগিতার ধরনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।