নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ মে ২০২৫
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে ‘জনকল্যাণমূলক কাজ’-এর নামে ফসলি কৃষিজমি ধ্বংস করে বাণিজ্যিকভাবে মাটি ফেলার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বিটঘর ইউনিয়নের মহেশপুর এলাকায় শত শত একর উর্বর জমি এখন হুমকির মুখে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশনের নামে এসব জমিতে বিশাল বাঁধ (ডেক) তৈরি করে অবাধে মাটি ফেলছে, যার পেছনে কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে। আর এই মাটি ব্যবসা ঘিরেই চলছে প্রভাবশালীদের ‘মধু খাওয়ার’ উৎসব—হতাশ কৃষকরা দেখছেন তাদের জীবিকার ভিত্তি ধ্বংস হতে।
এলাকাবাসী জানায়, ‘জাহেরা আহামেদ ফাউন্ডেশন’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প—যেমন অটিজম পুনর্বাসন কেন্দ্র, মাদ্রাসা, স্কুল ও হাসপাতাল স্থাপনের কথা বলে অনুমোদন নিয়েছে। তবে বাস্তবে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নের চেয়ে জমিতে বাঁধ তৈরি ও মাটি ফেলার দিকেই তাদের আগ্রহ বেশি। ড্রেজার ব্যবহার করে বিল থেকে মাটি তোলা হচ্ছে এবং ফসলি জমিতে সেই মাটি ফেলে জমিকে অনাবাদী করে তোলা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, মাটি ফেলার কারণে জমির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্যানেল বা ড্রেনেজ না থাকায় জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, ফলে ভবিষ্যতে চাষাবাদের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় চাষাবাদ বন্ধ হলে কৃষিজীবীরা তাদের আয়ের উৎস হারাবে।
এই কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছে ‘চায়না বাংলা’ ও ‘গ্রেট ওয়াল শিপ বিল্ডার্স’-এর মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান, যারা ফাউন্ডেশনের নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকার মাটি বাণিজ্যে জড়িত বলে অভিযোগ। এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে, যেটিই আসল উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন অনেকে।
জমিতে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে মাটি-মাফিয়ার দল সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা করে এবং ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
মৃৎবিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে মাটি ভরাট অব্যাহত থাকলে নবীনগরের উর্বর কৃষিজমি দ্রুত হারিয়ে যাবে, যা খাদ্য উৎপাদনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, মাটি ব্যবস্থাপনা আইনকে তোয়াক্কা না করে প্রভাবশালী মহল এসব কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া একটি ফাউন্ডেশন কীভাবে এত বড় কর্মকাণ্ড চালায়?
এ বিষয়ে জাহেরা আহামেদ ফাউন্ডেশনের মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন জানান, ‘সরকারি নিয়ম মেনেই আমরা কাজ করছি। এখনো সরকারি মাটি ফেলতে পারছি না, কারণ অনুমোদন পাইনি। অনুমোদন পেলে কাজ শুরু করব।’
ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফরিদ আহামেদ বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে বৈধভাবে কাজের অনুমতি নিয়েই আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’
তবে নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, ‘কৃষি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন। জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবস্থা না থাকলে কৃষকরা চাষে আগ্রহ হারাবে এবং পতিত জমির পরিমাণ বাড়বে।’
বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘কৃষি জমি ধ্বংসের অভিযোগ আমরা গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছি।’
অন্যদিকে, নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব চৌধুরী বলেন, ‘এই উপজেলায় মাটি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত হয়নি। তারা যে ডাইক করেছে, তার কোনো বৈধতা নেই।’
খবরওয়ালা/এসআর