খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
রমজান মাস মানেই আত্মশুদ্ধি এবং ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য সুযোগ। এই ভাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যায় সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা শরীফে। এখানকার বিশাল মাঠজুড়ে সাদা শামিয়ানার নিচে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করতে বসেন। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই আয়োজন কেবল সাতক্ষীরা নয়, বরং পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশনের এই উদ্যোগটি এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ ইফতার মাহফিল হিসেবে স্বীকৃত।
নলতার এই ইফতার আয়োজনের গোড়াপত্তন হয় ১৯৩৫ সালে। প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক, শিক্ষা অনুরাগী এবং সমাজ সংস্কারক খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (র.) এই ঐতিহ্য শুরু করেছিলেন। শুরুতে এটি ছিল মিশনের মসজিদে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে কিছু রোজাদারের জন্য একটি আয়োজন। কালক্রমে তাঁর সেই ত্যাগের মহিমা এবং ভক্তদের ভালোবাসায় এর পরিধি বিস্তৃত হতে হতে আজকের এই বিশাল রূপ নিয়েছে। তাঁর ওফাতের পরও মিশন কর্তৃপক্ষ এবং পীর কেবলার ভক্তরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করা কোনো সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন হয় দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং শত শত মানুষের নিরলস পরিশ্রম। মিশনের হিসাব অনুযায়ী, পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার অন্তত ৪০ দিন আগে থেকেই কেনাকাটা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি শুরু হয়। রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে রোজাদারদের বাঁচাতে তৈরি করা হয় বিশাল আয়তনের অস্থায়ী ছাউনি।
নিচে এই বিশাল ইফতার আয়োজনের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও জনবলের একটি খতিয়ান দেওয়া হলো:
| উপকরণের বিবরণ | দৈনিক পরিমাণ / তথ্য |
| অংশগ্রহণকারী রোজাদার | প্রায় ৬,০০০ জন |
| স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা | ২৫০ থেকে ৩০০ জন |
| ফিরনির জন্য দুধ | ৫০০ কেজি |
| ছোলার পরিমাণ | ২৫০ কেজি |
| সেদ্ধ ডিম | ৬,০০০টি |
| ময়দা ও সুজি | ২০০ কেজি ময়দা ও ১১০ কেজি সুজি |
| চিড়া ও চিনি | ১৫০ কেজি চিড়া ও ১৫০ কেজি চিনি |
| আলুর ব্যবহার | আড়াই মণ (প্রায় ১০০ কেজি) |
| দৈনিক আনুমানিক ব্যয় | ২ লক্ষ ৬০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা |
মিশন কর্তৃপক্ষ রোজাদারদের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ইফতারে সাত ধরণের পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করেন। এর মধ্যে থাকে চিড়া, কলা, ছোলা ভুনা, শিঙাড়া, ফিরনি, খেজুর এবং ডিম। এই আইটেমগুলো প্রতিদিন ভোরে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রান্না শুরু হয়। বিশেষ করে এখানকার ‘ফিরনি’ অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা তৈরির জন্য প্রতিদিন ভোরে উনুনে চড়ানো হয় শত শত কেজি দুধ। বাবুর্চি মোক্তার আলী, যিনি গত ৪৫ বছর ধরে এই মহৎ কাজের সাথে যুক্ত, তিনি জানান যে এটি কেবল পেশা নয়, বরং রোজাদারদের সেবা করার মাধ্যমে পরম আত্মতৃপ্তি পাওয়ার এক সুযোগ।
নলতা শরীফের এই ইফতার মাহফিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ। বেলা ৩টার পর থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা মাঠজুড়ে মাদুর বিছিয়ে প্লেট ও গ্লাস সাজাতে শুরু করেন। বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের মধ্যে পরিবেশন সম্পন্ন হয়। এখানে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু কোনো ভেদাভেদ নেই। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে ঢাকা, খুলনা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ একই কাতারে বসে ইফতার করেন।
ঢাকার মিরপুর থেকে আসা দর্শনার্থীরা জানান, কয়েক হাজার মানুষের একই সময়ে ইফতার করার এই দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে এর বিশালতা উপলব্ধি করা অসম্ভব। মিশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও সেবার মানসিকতা জাগ্রত করা। খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ (র.)-এর আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ভক্তদের আর্থিক সহযোগিতায় এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়। বর্তমান সময়ের যান্ত্রিক জীবনে নলতার এই গণ-ইফতার মানবিকতার এক অনন্য আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।