খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই মে ২০২৬, ৬:৫৭ পিএম
দীর্ঘ ২২ বছর আগে রাজধানীর শ্যামপুরে বিএনপি নেতা নাঈম শিকদার বিন্দুকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় চাঞ্চল্যকর রায় প্রদান করেছেন আদালত। রবিবার (৩ মে) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক জাকারিয়া হোসেন এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ছয়জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পাশাপাশি প্রত্যেককে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করলেও আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় তাকেও সাজা প্রদান করা হয়েছে।
আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন: ১. শামীম হোসেন শিকদার ২. শহিদুল ইসলাম ওরফে ঠোঁটকাটা রিপন ৩. শহীদ ওরফে ড্রাইভার শহীদ (মৃত) ৪. শহিদ হোসেন ওরফে সেঞ্চু ৫. দুলাল ওরফে কালা দুলাল ওরফে জাকির হোসেন ৬. আমিনুল ইসলাম
আদালতের উচ্চমান বেঞ্চ সহকারী ফকির জাহিদুল ইসলাম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি দণ্ডিত প্রত্যেক আসামিকে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই অর্থদণ্ড অনাদায়ে আসামিদের আরও এক বছর বিনাশ্রম কারাভোগ করতে হবে।
রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে কেবল আমিনুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালত তাকে সাজা পরোয়ানা মূলে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করে। অন্যদিকে, পলাতক থাকা অপর আসামিদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মৃত আসামি ড্রাইভার শহীদের সাজার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে জানানো হয়েছে যে, বিচার চলাকালে কোনো আসামি মারা গেলেও অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে সাজা দেওয়ার আইনি রীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
মামলার নথি ও প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, নাঈম শিকদার বিন্দুর সঙ্গে আসামিদের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। কমিশনার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। বিরোধের জেরে আসামিরা নাঈমকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।
ঘটনার দিন, ২০০৪ সালের ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক সোয়া ৭টার দিকে শ্যামপুরের ২১৩ নম্বর কলিমুল্লাহ বাগ বটতলা সংলগ্ন ‘গোল্ডেন হেয়ার ড্রেসার’-এর সামনে নাঈম অবস্থান করছিলেন। ওত পেতে থাকা আসামিরা হঠাৎ তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। এতে ঘটনাস্থলেই নাঈম শিকদার বিন্দুর মৃত্যু হয়। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পরদিন, ১৭ নভেম্বর নাঈমের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বাদী হয়ে রাজধানীর কদমতলী থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর কদমতলী থানা পুলিশ মামলার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তদন্তে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় এবং প্রকৃত ঘাতকদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) প্রদান করা হয়। ডিবি পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পেলেও এজাহারভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করে।
বাদী সাবিনা ইয়াসমিন ডিবি পুলিশের দাখিল করা ওই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে ‘নারাজি’ আবেদন দাখিল করেন। আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করে মামলার অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে (Criminal Investigation Department) প্রদান করে। সিআইডি পুলিশের ইন্সপেক্টর মঞ্জুরুল রহমান ভূঁইয়া মামলাটি পুনরায় গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করেন এবং ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৩০ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ বিচার চলাকালীন আদালত রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। সাক্ষীদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা এবং দীর্ঘ শুনানির পর আদালত এই রায় প্রদান করেন।
মামলার বিচার চলাকালে একমাত্র উপস্থিত আসামি আমিনুল ইসলাম আত্মপক্ষ শুনানিতে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন এবং আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। তবে পলাতক থাকা অন্যান্য আসামিরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল না। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত আজ আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর এই রায় ঘোষণার মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী আইনি প্রক্রিয়ার অবসান ঘটল। যদিও মৃত ব্যক্তির সাজা কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই, তবে অপরাধের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আদালতের এই রায়টি একটি আইনি নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। মামলার এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সাজার বাকি অংশ কার্যকর করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মন্তব্য