খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পাঠানো এক খোলাচিঠিতে এই আহ্বান জানান সংস্থাটির মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। লন্ডনভিত্তিক এই মানবাধিকার সংস্থাটি মনে করে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে তাদের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণের সুযোগ রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চিঠিতে নির্বাচনের প্রাক্কালে সাংবাদিকদের ওপর ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন (ATA)’-এর অপব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত হবে। চিঠিতে গত কয়েকমাসে ঘটে যাওয়া কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যা দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতির নাজুকতাকে নির্দেশ করে।
নিচে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক উল্লিখিত কিছু প্রধান উদ্বেগ ও ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
| বিষয়/ঘটনা | বিবরণ ও তারিখ | অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণ |
| সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার | সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না (আগস্ট ২০২৫) ও আনিস আলমগীরকে (ডিসেম্বর ২০২৫) গ্রেপ্তার। | এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ। |
| সংবাদপত্রের ওপর হামলা | ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং নূরুল কবীরকে হেনস্তা। | গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের ব্যর্থতা। |
| পিটিয়ে হত্যা (লিঞ্চিং) | ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যা। | নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন রক্ষায় কর্তৃপক্ষের দুর্বলতা। |
| আইনি বাধ্যবাধকতা | আইসিসিপিআর (ICCPR) সনদের বাস্তবায়ন। | আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি অনুযায়ী নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় সরকার ব্যর্থ। |
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান প্রশাসন নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, “শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের জন্য কাউকে যেন জীবনের ভয়ে থাকতে না হয়, সরকারকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আগামী কয়েকটি সপ্তাহ প্রমাণ করবে যে, সরকার তাঁর ম্যান্ডেট অনুযায়ী মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে কতটুকু আন্তরিক।”
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, মৌলিক স্বাধীনতার ওপর যে কোনো বেআইনি বিধিনিষেধ জনসাধারণের মুক্ত আলোচনাকে ব্যাহত করে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনীত রাষ্ট্রদ্রোহ বা সরকার উৎখাতের মতো গুরুতর অভিযোগগুলো যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিষিয়ে তুলবে।
খোলাচিঠিতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে ‘প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়’ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংস্থাটি সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে যেন নির্বাচনের সময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নির্ভয়ে তাঁদের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নাগরিকেরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে প্রশাসনকে কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই চলবে না, বরং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
সবশেষে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আশা প্রকাশ করেছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের পূর্ববর্তী এই সংকটাপন্ন সময়ে আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক এবং ভীতিহীন নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করবে।