খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলার চিত্রকলায় যিনি লৌকিকতার অন্তর সুরকে আধুনিকতার শক্তিশালী প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে মিলিয়ে এক অনন্য স্বর তৈরি করেছিলেন—তিনি পটুয়া কামরুল হাসান। তাঁর তুলির ছোঁয়ায় আবহমান বাংলার জীবন, লোকঐতিহ্য, মানবিকতা, রাজনীতি ও প্রতিবাদের চেতনা এক সঙ্গে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই স্বাতন্ত্র্যের কারণে তিনি ‘পটুয়া’ নামে খ্যাতি অর্জন করেন।
১৯২১ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস থেকে ১৯৪৭ সালে চিত্রকলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর দেশবিভাগের সময় ঢাকায় চলে আসেন। এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে মিলিয়ে আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন—যার হাত ধরে আধুনিক শিল্পশিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে।
কামরুল হাসান কেবল নান্দনিকতার শৈল্পিক অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন গণমানুষের শিল্পী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি সংকটে তিনি তুলি হাতে তুলে নিয়েছেন প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে। তাঁর চিত্রকর্ম যুগে যুগে মানুষের বিবেককে আন্দোলিত করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর চিত্রকর্ম ‘এই জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে’ ছিল পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খানের হিংস্র মুখাবয়ব তুলে ধরে জনগণের ক্ষোভ ও সংগ্রামের চেতনার এক জ্বলন্ত প্রতীক। শিল্প শুধু শিল্প নয়, প্রতিরোধের অস্ত্রও হতে পারে—এই চিত্র তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত নকশা ও সরকারের মনোগ্রাম প্রণয়নেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘তিন কন্যা’ ও ‘নাইওর’–এর ওপর ভিত্তি করে যুগোশ্লাভিয়া ও বাংলাদেশের স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বহন করে।
১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, দ্বিতীয় জাতীয় কবিতা উৎসবের সভাপতির বক্তৃতা দেওয়ার সময় হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগেও তুলি থামেনি—তার শেষ সৃষ্টি ছিল স্বৈরাচারবিরোধী পোস্টার ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’—একটি দুঃসাহসী সতর্কবার্তা, এক শিল্পীর শেষ লড়াই।
পটুয়া কামরুল হাসান ছিলেন শিল্পের সৈনিক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিনাশী চেতনার প্রতীক। আজ তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
খবরওয়ালা /এসএস