মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ মার্চ ২০২৫
আদর, স্নেহ, ভালোবাসা আর আবেগে জড়িয়ে থাকা শব্দটির নাম ‘শিশু’। কেবলমাত্র কোথায়, কার ঔরসে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা – সেই পরিচয়টাই নির্ধারণ করে দেয় সমাজে কোথায় হবে তার অবস্থান। সে কি হবে বিত্তবান, উচ্চমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, গরীব পরিবারভুক্ত – নাকি এই শ্রেণীগুলোর বাইরে অন্য কোন পরিচয়ের মানুষ বা অন্য কোন জীব! বাস্তবে দেখা যায়, যে সব শিশু পিতৃ কিংবা মাতৃহীন, মা তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বাবা মারাত্মক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, মাদকাসক্ত কিংবা পিতা-মাতা সংসার চালাতে অক্ষম, সেই সব ঘরের শিশুরা চলে আসতে বাধ্য হয় রাস্তায়, আর বেঁচে থাকার তাগিদে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে দূরে সরে এসে তাদেরকে ব্যস্ত সময় পাড়ি দিতে হয় নানা পেশায়। সেই ভোর থেকে শুরু হয়ে রাতের অনেকটা সময় জুড়ে ওদেরকে কাজ করে খেতে হয়। একটু ভুল হলেই সাথে সাথে মালিকের হাতে মার। কখনও কখনও তাকে কাজও হারাতে হয়।
আমাদের চারপাশে এই হতভাগা শিশুদের কতভাবেই আমরা দেখি প্রতিদিন। রেল স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার আগে-পরে ছোট-বড় ব্যাগ মাথায় ও হাতে নিয়ে ছুটতে দেখা যায় অনেককেই। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা বোতল, পলিথিন, কাগজসহ মানুষের ব্যবহৃত ছুঁড়ে ফেলা জিনিসপত্র কুড়িয়ে বিক্রি করে পেটের ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করে এদের কেউ কেউ। রাস্তার সিগন্যাল, ফুটপাথ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায় এদের অনেকে নামমাত্র মূল্যে বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করা ফুল বিক্রি করছে, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করছে। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত এসব শিশুরা খালি গায়ে, খালি পায়ে কিংবা ছেঁড়া জামাকাপড় পরে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়।
জীবন সংগ্রামী এসব চিরযোদ্ধা শিশুরা আরো যে-সব কাজ-কর্মে জড়িয়ে পড়ে তার মধ্যে রয়েছে কুলি, হকার, মোটর-রিকশা বা সাইকেল গ্যারেজের শ্রমিক হিসেবে। অনেকে আবার চা স্টল, হোটেল বা রেস্টুরেন্টের সহকারী শ্রমিক হয়ে, কখনো বুনন কর্মী, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক ইত্যাদি পেশায় যুক্ত হয়ে। বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও নামমাত্র পারিশ্রমিকে এসব শিশুরা কাজ করে থাকে। যেমন- বাড়িঘর নির্মাণ কালে রাজমিস্ত্রীর সাহায্যকারী হিসাবে, ওয়েলডিং কারখানার শ্রমিকের কাজে, বিভিন্ন শিল্প কলকারখানার নানারকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ইত্যাদি। এসব শিশুদের অনেকেই আবার জীবন জীবিকার পথ খোঁজে ট্যাক্সি, ম্যাক্সি, টেম্পু, মাইক্রোবাসের হেলপার হয়ে, কেউ কাঠমিস্ত্রির সহকারীর দায়িত্ব পালন করে। অভাবের তাড়নায় ওদের অনেকেই বাধ্য হয় জ্বলন্ত কয়লার লেলিহান আগুনের শিখা কিংবা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে। সবখানেই ওদের পরিচয় কখনো ‘টোকাই’ বা ‘পিচ্চি’ নামে। ব্যাপক পুষ্টিহীনতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এসব শিশুরা শৈশবেই এমন সব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সম্পৃক্ত হয়, যার ফলে ওদের শারিরীক ও মস্তিস্ক গঠনে যেমন বাঁধার সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার ফলে ওদের জীবনে অনেক মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটে। ফলে অনেক কঠিন রোগে আক্রান্ত হতে হয় এসব শিশুদের। অনেক সময় সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্বও বরণ করতে হচ্ছে, জীবনী শক্তি ক্ষয়ে অনেক শিশু মারাও যাচ্ছে। নিছক তার নিজের বেঁচে থাকার জন্য বা বাবা-মা, ভাইবোনদের বেঁচে থাকার রসদ যোগানোর জন্য কাঁচা বয়সে এসব শিশুদের এমন সব কাজ বিশ্ব মানবতাকে পরিহাস করে। শুধু তাই নয় এসব শিশুদের চোরাচালান ও মাদক বেচাকেনার কাজেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাদের ক্ষুধা ও দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে অনেকে তাদেরকে আরো নানারকম বিভিন্ন অপকর্মেও জড়িয়ে ফেলে।
আর এসব কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষের ধিক্কার, চড়-থাপ্পরসহ গালিগালাজ এমনকি শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে হয় প্রতিনিয়ত। ওরা যেন সমাজের সর্বোচ্চ অবহেলিত মানুষ। অনেক পথ শিশু মনে করে তারা আসলেই সমাজের অভিশাপ। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, তীব্র শীতসহ সকল পরিস্থিতিতেও ওরা কারো কাছ থেকে সহানুভূতি তো দূরের কথা, ন্যায্য পাওনাটুকুও পায় না কখনও। এদের একটি বড় অংশের প্রতিদিন রাত কাটে রাস্তা ও ফুটপাতে। অথচ, দেশের সরকার থেকে শুরু করে আমরা তথাকথিত সচেতন নাগরিকগণও এ ব্যপারে নির্বাক থেকে আসছি সবসময়ই। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থাগুলো এসব নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে শত শত পলিসি সংলাপ করেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। চারদিকে ভালোভাবে তাকালে দেখা যায় মধ্যম আয়ের উন্নতির গালভরা বুলির মাঝে এই মহানগরীতে দিন দিন ছিন্নমূল শিশুদের মিছিল কি হারে বেড়েই চলেছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৬৫ লক্ষ (৬.৬ মিলিয়ন) যা পৃথিবীর মোট শিশু শ্রমিকের ২.৬ অংশ। আমাদের মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশই শিশু, যাদের বয়স ১৬ বছরের কম। সমীক্ষায় দেখা যায়, এদের প্রতি ১০০ জনে ১৯ জন শিশু শ্রমিক। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রাস্তায় শিশুর সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অথচ, দেশে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে নানা আইন থাকলেও বেড়েই চলছে শিশুশ্রম। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ৩৪ ও ৩৫ অনুযায়ী ১৪ বছরের কোন শিশুকে কাজে নিয়োগ করা যাবে না। সেখানে আরও বলা হয়েছে শিশুর পিতা-মাতা কিংবা অভিভাবক শিশুকে দিয়ে কাজ করানোর জন্য কারও সাথে কোনো চুক্তি করতে পারবে না। কিন্তু এইসব নীতিকে পাশ কাটিয়েই শিশুদেরকে নিযুক্ত করা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে। আর্থিক দৈন্যতার কারণে শিশুদের অভিভাবকরাও অনেক সময় তাদের সন্তানদেরকে দিয়ে এমন সব কাজ করাতে চাপ প্রয়োগ করে থাকে।
শিশুদেরকে নিয়ে আমরা দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ঘটা করে কত দিবসই পালন করে থাকি। যেমন- এতদিন ১৭ ই মার্চ পালিত হয়েছে ‘জাতীয় শিশু দিবস’, প্রতিবছর ১২ জুন বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে পালিত হয় ‘শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস’। ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয়ভাবে পালন করা হয় ‘কন্যা শিশু দিবস’, ২রা অক্টোবর পালন করা হয় ‘পথশিশু দিবস’। আর ২০ নভেম্বর পালিত হয়ে থাকে ‘বিশ্ব শিশু দিবস’। এসব অনুষ্ঠানে দেশের নীতিনির্ধারকগণ এসে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে চলে যান। তাতে সমবেদনা ঝরে, এমনকি করণীয় কর্মসূচির কথাবার্তাও উচ্চারিত হয়। কিন্তু সেসবের বেশিরভাগই কেবল আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে ভরা।
আমাদের সংবিধানে প্রত্যেকটি মানুষের মৌলিক অধিকার দেওয়ার কথা বলা আছে। অথচ, এখনো অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত দেশের দরিদ্র ও অসহায় পথশিশুরা। কিন্তু প্রবহমান পুঁজিবাদী এই সমাজে রাজনীতিবিদরা ব্যস্ত আছেন নিজের মৌলিক চাহিদাকে পূরণ করার নিমিত্তে। শুধু তাদের মৌলিক চাহিদা বললে বড্ড ভুল হবে, বলা উচিৎ তাদের আগামী চৌদ্দ পুরুষ যেন মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত না হন সে লক্ষ্যে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে। আর যাদের মৌলিক অধিকারগুলো পাওয়া সবার আগে জরুরি, তারাই হচ্ছে সবসময় উপেক্ষিত। পথশিশু তথা সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের রক্ষায় বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা কাজ করলেও তার ব্যাপ্তি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত নয় আর্থিক সহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। অনেকক্ষেত্রে সরকারের অসহযোগিতাও এর জন্য অনেকটা দায়ী। এজন্য সবার আগে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ গড়ে তুলে এসডিজি’র এ সংক্রান্ত লক্ষ্য পূরণে সত্বর এগিয়ে আসতে হবে। সেইসাথে মাইক্রো পরিসরে সমাজের বিত্তশালীরা সচেতন হয়ে একটি-দুটি করে পথশিশুর দায়িত্ব নিলেও মানবিকতার জয়গান গাওয়া সম্ভব। আর সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে পারলেই এ সব পথশিশুরা দেশের বোঝা হওয়ার পরিবর্তে হয়ে উঠতে পারে আমাদের দেশের জাতীয় মানব সম্পদ।
লেখক গবেষক, সমাজ বিশ্লেষক ও উন্নয়ন এডভোকেট মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ।