খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পাকিস্তানের বিচারিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ের অবসান ঘটল। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ইসলামাবাদের উচ্চ আদালতে বিচারপতির আসনে বসে সহস্রাধিক মামলার রায় প্রদানকারী তারিক মাহমুদ জাহাঙ্গিরী শেষ পর্যন্ত জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে অপসারিত হয়েছেন। গত সোমবার ইসলামাবাদ হাইকোর্ট ১১৬ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত ও ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে তাঁর নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে তাঁকে পদচ্যুত করে। এই ঘটনাটি পাকিস্তানের বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, তারিক মাহমুদ জাহাঙ্গিরীর পুরো শিক্ষাজীবনই ছিল সুপরিকল্পিত জালিয়াতির জালে ঘেরা। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে তিনি একটি ভুয়া এনরোলমেন্ট নম্বর ব্যবহার করে আইন পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করেছিল। কিন্তু এই সাজা ভোগ না করে তিনি পরের বছরই আরও বড় জালিয়াতির আশ্রয় নেন। ‘ইমতিয়াজ আহমেদ’ নামক এক মেধাবী ছাত্রের এনরোলমেন্ট নম্বর চুরি করে নিজের নাম সামান্য পরিবর্তন করে পুনরায় পরীক্ষায় বসেন তিনি।
সরকারি ইসলামিয়া ল কলেজের অধ্যক্ষ আদালতকে নিশ্চিত করেছেন যে, জাহাঙ্গিরী কখনোই তাঁদের প্রতিষ্ঠানের বৈধ ছাত্র ছিলেন না। অর্থাৎ, যে ওকালতি ডিগ্রির ওপর ভিত্তি করে তিনি উচ্চ আদালতের বিচারপতি হয়েছিলেন, তার কোনো আইনি ভিত্তিই ছিল না।
| বিষয় | বিস্তারিত তথ্য |
| অভিযুক্তের নাম | তারিক মাহমুদ জাহাঙ্গিরী |
| নিয়োগের সময়কাল | ডিসেম্বর ২০২০ |
| মোট বিচারিক সময় | প্রায় ৫ বছর |
| প্রধান অভিযোগ | এলএলবি (LLB) ডিগ্রির জালিয়াতি ও তথ্য গোপন |
| শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম | সরকারি ইসলামিয়া ল কলেজ (ভুয়া দাবি) |
| প্রাথমিক জালিয়াতি | ১৯৮৮ সালে এনরোলমেন্ট নম্বর জালিয়াতি |
| চূড়ান্ত রায় | ১১৬ পৃষ্ঠার রায়ে পদচ্যুতি (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) |
ইসলামাবাদ হাইকোর্ট তাঁর আইনবিদ্যার ডিগ্রিটিকে শুরু থেকেই ‘বাতিল এবং অকার্যকর’ ঘোষণা করেছে। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাহাঙ্গিরীকে তাঁর মূল নথিপত্র এবং লিখিত জবাব পেশ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও একাধিক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের সপক্ষে কোনো বৈধ প্রমাণ উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।
উল্টো বিচারিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে তিনি নানা চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি বারবার ফুল বেঞ্চ গঠনের দাবি জানানো, প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ চাওয়া এবং সিন্ধু হাইকোর্টে মামলা ঝুলে থাকার অজুহাতে শুনানি পেছানোর আবেদন করেছিলেন। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, যেহেতু আবেদনকারী জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পেশ করেছেন, তাই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার দায়ভার ছিল জাহাঙ্গিরীর ওপর। তা করতে না পারায় আদালত তাঁকে একজন ‘চরম জালিয়াত’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে তিনি অসংখ্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার রায় দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, একজন ভুয়া বিচারপতির দেওয়া সেই রায়গুলোর আইনি বৈধতা কী হবে? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা পাকিস্তানের বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বলতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর বিচারিক কার্যক্রমের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, সোমবারের এই চূড়ান্ত রায় পাকিস্তানের আইনি ইতিহাসে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।