খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ আগস্ট ২০২৫
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ পাঠ্যবই থেকে পুরোপুরি সরানোর প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে। পূর্ণাঙ্গ ভাষণের পরিবর্তে সংক্ষেপিত রূপ শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার (১৮ আগস্ট) এনসিটিবি কার্যালয়ে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পরিমার্জিত পাঠ্যপুস্তক অনুমোদন সংক্রান্ত সভায় এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এর আগে ৮ম শ্রেণির বই থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পুস্তক পর্যালোচনাকারী শ্রেণি শিক্ষকরা।
সভায় জুলাই আন্দোলন নিয়ে লিখিত ‘আমাদের নতুন গৌরবগাঁথা’ প্রবন্ধে খণ্ডিত চিত্র উপস্থাপন এবং গণহত্যার ইতিহাস থেকে শেখ হাসিনার নাম ‘সুকৌশলে’ বাদ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। প্রস্তাবকারী এ বিষয়ে সংশোধনের দাবি জানান।
এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, শ্রেণি শিক্ষকদের পরামর্শে প্রাথমিকভাবে ভাষণটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর বিরোধিতা করেন। বৈঠকে উচ্চবাচ্য বিনিময় হলেও শেষ পর্যন্ত ৮ম শ্রেণির বইয়ে ভাষণ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। মূল বার্তা অক্ষুণ্ন রেখে নির্বাচিত অংশ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর রবিউল কবীর চৌধুরী জানান, “৮ম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে আগেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল। এবার এটি সংক্ষিপ্ত আকারে থাকবে। একাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য।”
সভায় রবিউল কবীর চৌধুরী ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ৭ মার্চের ভাষণ বইয়ে রাখার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। প্রশাসনের অপর একটি পক্ষ বিরোধিতা করলেও সেটি গৃহীত হয়নি। ফলে ভাষণ সংক্ষিপ্ত আকারে রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।
এনসিটিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে হট্টগোল হয়েছে। অনেকে এটিকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে বইয়ে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে তারা সংক্ষিপ্ত আকারে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে ভাষণ বই থেকে যাচ্ছে।”
শেখ হাসিনার নাম গোপনের অভিযোগ
নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য অংশে অন্তর্ভুক্ত ‘আমাদের নতুন গৌরবগাঁথা’ গদ্যটি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবকারীর অভিযোগ—তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম কৌশলে গোপন করা হয়েছে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তাদের মতে, অপরাধী ও অনুঘটকদের নাম এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং গদ্যে কিছু শব্দ পরিবর্তনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। যেমন—‘শাসক’, ‘দুর্বৃত্তবাহিনী’, ‘তার আছে দলীয় বাহিনী’ ও ‘আন্দোলনকারী ছাত্র জনতা’ শব্দগুলোর পরিবর্তে যথাক্রমে ‘স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা’, ‘আওয়ামী লীগ’ এবং ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী’ ব্যবহার করার প্রস্তাব এসেছে।
প্রস্তাবকারীর দাবি—রচনায় শেখ হাসিনার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এমনভাবে যে পাঠক বুঝতেই পারবেন না জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে। এছাড়া এতে ফ্যাসিবাদী শাসনের নৃশংসতা, জনতার বিস্ফোরণ ও বৈপ্লবিক মুহূর্তের বর্ণনা অনুপস্থিত এবং সাহিত্যমানও দুর্বল।
বেশি পরিবর্তনের প্রস্তাব নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে
এনসিটিবির চেকলিস্ট অনুযায়ী, ৮ম শ্রেণির বইয়ে ৭ মার্চের ভাষণের পাশাপাশি হুমায়ুন আজাদ ও আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা পর্যালোচনার অনুরোধ এসেছে। তবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে।
এই বইয়ের ‘রহমানের মা’ গল্পটি পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে ধর্মীয় অনুভূতির সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায়। অভিযোগ অনুযায়ী, গল্পটি নিকাব খোলার মাধ্যমে শহীদ জননীর গৌরব প্রকাশকে প্রতীকায়িত করেছে, যা ‘গৌরব’ ও ‘বোরখা’র মধ্যে বিরোধ কল্পনা করে এবং মুসলিম সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতির সাথে সাংঘর্ষিক। এর পরিবর্তে অন্য গল্প যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে।
একই বইয়ের ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ নাটকটি ভাষা ও সংলাপের কারণে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবকারীদের মতে, নাটকটিতে গালি ব্যবহারের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং এটি সাহিত্যিক মানদণ্ডেও ব্যতিক্রমী নয়।