খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
দেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সরকারের ভেতরের একটি অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, এই হামলা কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত, সুসংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত একটি ষড়যন্ত্রের অংশ।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় এসব মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। দেশে চলমান ‘মব ভায়োলেন্স’ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতার প্রতিবাদে সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ এবং নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কী কী ঘটনা ঘটানো হবে, তার একটি পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি ছিল। আমরা ঘটনার পরপরই বলেছি, এতে সরকারের ভেতরের একটি অংশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এই ঘটনার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে একটি সম্মতি তৈরি করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যাকআপও ছিল।” তিনি আরও বলেন, “এই তিনটি বিষয়—ভেতরের সমর্থন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনা—একসঙ্গে না থাকলে ওই রাতে এমন সাহসী ও ভয়াবহ হামলা সম্ভব হতো না।”
তিনি অভিযোগ করেন, যারা ওই রাতে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে, তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্লোগান ও প্রতীক ব্যবহার করেছে। শরিফ ওসমান হাদির নাম এবং আন্দোলনের ভাষাকে তারা নিজেদের অপকর্ম ঢাকার জন্য ব্যবহার করেছে। “আমাদের স্লোগান ব্যবহার করে যারা হামলা করেছে, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক,” বলেন নাহিদ।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা যে বাংলাদেশ কল্পনা করেছিলাম, আজকের বাস্তবতা তার সঙ্গে মিলছে না। দেড় বছর পার হয়ে গেছে। এখন যা ঘটছে, তা আর স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি পরিকল্পিত অপরাধ।” তিনি বলেন, শুরুতে ‘মব ভায়োলেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করতে তারা দ্বিধায় ছিলেন, কারণ গণ-অভ্যুত্থানকে প্রতিপক্ষরা ‘মব’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সহিংসতাকে আর অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
নিজেদের দায় স্বীকার করে নাহিদ বলেন, “আমাদের সবারই কিছু দায় আছে। বিশেষ করে যারা জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম। এই দায় আমাদের আরও বেশি।”
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কারা ওই রাতে হামলা চালিয়েছে, কারা সমর্থন দিয়েছে, কারা সেখানে উপস্থিত ছিল—সবকিছু স্পষ্ট। এখন আমাদের সবাইকে সরকারকে বাধ্য করতে হবে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে।” একই সঙ্গে তিনি শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে গুলি করার ঘটনাটিরও দ্রুত বিচার দাবি করেন।
সভায় সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী রেহনুমা আহমেদ, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি।
বক্তারা সবাই একমত হন যে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলা শুধু গণমাধ্যমের ওপর আঘাত নয়; এটি গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ওপর সরাসরি আক্রমণ। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার না হলে ভবিষ্যতে এমন সহিংসতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা সতর্ক করেন।