হোসনে আরা জেমী
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
বছর ঘুরে আবারও এসেছে পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের এই উৎসব বাঙালির জীবনে শুধু একটি তারিখ নয়, বরং এক আবেগ, এক ঐতিহ্য। তবে ভৌগোলিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে এই আবেগের প্রকাশও বদলে যায় বিশেষ করে প্রবাস জীবনে।
বাংলার শহর বগুড়া-তে বৈশাখ মানেই ছিল সহজ, প্রাণবন্ত এক উদ্যাপন। ভোরের আলোয় জেগে ওঠা শহর, মানুষের কোলাহল, আর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদী-র শান্ত স্রোত সব মিলিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার ছিল এক নিজস্ব সৌন্দর্য। প্রকৃতিও যেন এই উৎসবে শরিক হতো। গাছে নতুন পাতা, বাতাসে হালকা উষ্ণতা, আর বিকেলের আকাশজুড়ে রঙের মেলা।
শৈশবের বৈশাখ ছিল আরও নির্মল বৃষ্টিতে ভেজা, আম কুড়ানো, খোলা মাঠে ছুটে বেড়ানো, আর নির্ভার সময় কাটানোর আনন্দে ভরা। সেই সময়ের সম্পর্কগুলোও ছিল সহজ ও আন্তরিক, যেখানে “আমরা” শব্দটি ছিল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে অনেকেই পাড়ি জমায় দূরদেশে। আজকের বাস্তবতায় কানাডা-র মতো দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের কাছে বৈশাখ আসে ভিন্ন রূপে। এখানে বসন্তের আবির্ভাব ঘটে ধীরে বরফ গলে, গাছে কুঁড়ি ফোটে, প্রকৃতি নতুন করে জেগে ওঠে। তবুও এই পরিবর্তনের ভেতরেও বাংলার বৈশাখের সেই প্রাণোচ্ছলতা অনুপস্থিত থাকে না।
প্রবাসে বৈশাখ এখন অনেকটাই কমিউনিটি নির্ভর। বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবেশন। এসব আয়োজন প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ তৈরি করার চেষ্টা করে। তবে ব্যক্তিগত স্মৃতির গভীরতা সেখানে অনুপস্থিত থেকে যায়।
প্রবাস জীবনে বৈশাখ তাই হয়ে ওঠে স্মৃতির আরেক নাম। এটি মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের দিনগুলোতে। যেখানে ছিল সরলতা, সম্পর্কের উষ্ণতা, আর প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক। আজকের ব্যস্ত জীবনে সেই
অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে বৈশাখ কেবল একটি উৎসব নয়; এটি শিকড়ের প্রতি এক নীরব টান। দূরদেশে বসেও মানুষ তার উৎস, তার অতীত, তার পরিচয়কে মনে রাখতে চায়। আর সেই স্মৃতিই প্রবাসের বৈশাখকে করে তোলে ভিন্ন, কিন্তু গভীরভাবে অর্থবহ।
নতুন বছর তাই শুধু সময়ের পরিবর্তন নয় এটি নিজেকে ফিরে পাওয়ার এক সুযোগ, স্মৃতিকে নতুন করে অনুভব করার এক উপলক্ষ।
লেখকঃ প্রবাসী কবি,লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক