খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় আবাসিক ভবনে গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তাদের মৃত্যু হয়। মৃতদেহগুলো তাদের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নের দলদলা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার পর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। বর্তমানে ওই পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে সবজি বিক্রেতা আব্দুল মান্নান তাঁর পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চাঁনপুর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। গত ১১ জুন ভোরে ওই বাসায় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, রাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার থেকে কোনোভাবে গ্যাস নির্গত (লিক) হয়ে সারা রাত ঘরের ভেতরে জমা হয়েছিল। ভোরবেলা আব্দুল মান্নানের স্ত্রী সুলতানা বেগম রান্নাঘরে দিয়াশলাই বা অন্য কোনো উপায়ে আগুন জ্বালানোর সাথে সাথে ঘরের ভেতরে জমে থাকা গ্যাসে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা পরিবারের সকল সদস্য এবং একজন প্রতিবেশী শিশু গুরুতরভাবে দগ্ধ হন।
বিস্ফোরণের পরপরই দগ্ধদের উদ্ধার করে দ্রুত রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১২ জুন থেকে ১৫ জুনের মধ্যে একই পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু হয়।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান হতাহতদের চিকিৎসার ও দগ্ধ হওয়ার প্রকৃত বিবরণ নিশ্চিত করেছেন। নিচে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থা এবং বর্তমান পরিস্থিতি টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ব্যক্তির নাম ও পরিচয় | দগ্ধ হওয়ার পরিমাণ (শতাংশ) | বর্তমান অবস্থা / মৃত্যুর সময় |
| সুলতানা বেগম (স্ত্রী) | ৯০% | ১২ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথম মৃত্যু হয়। |
| আব্দুল মান্নান (গৃহকর্তা) | ৩৫% | ১৫ জুন (সোমবার) ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। |
| সিয়াম (ছেলে) | ৭৭% | ১৫ জুন (সোমবার) সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। |
| মিম আক্তার (১৩, মেয়ে) | ৪১% (শ্বাসনালীসহ) | আইসিইউতে চিকিৎসাধীন, অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। |
| হযরত আলী (প্রতিবেশী শিশু) | — | গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। |
হাসপাতাল থেকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার রাতে নিহত তিনজনের মরদেহ নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নের দলদলা গ্রামে নিয়ে আসা হয়। গভীর রাতে মরদেহগুলো গ্রামে পৌঁছালে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। পরবর্তীতে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় স্থানীয় মাঠে তাদের যৌথ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা, মা ও ছেলেকে পাশাপাশি তিনটি কবরে দাফন করা হয়। দাফন কার্যক্রমে এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন এবং এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান আরও জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন কিশোরী মিম আক্তারের শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শরীরের ৪১ শতাংশ দগ্ধ হওয়ার কারণে তাকে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা এখনও সম্পূর্ণ সংকটাপন্ন ও ঝুঁকিমুক্ত নয়। অন্যদিকে চিকিৎসাধীন প্রতিবেশী শিশু হযরত আলীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে মেডিকেল টিম কাজ করছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ঘটনার পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।