খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 8শে মাঘ ১৪৩২ | ২১ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর: অপরাধীদের অভয়ারণ্য
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সম্প্রতি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-এর ওপর চালানো হামলার ঘটনায় আবারও নজর কেড়েছে এই এলাকায় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের মতে, এই এলাকা ‘দেশের ভেতর আরেক দেশ’ বা ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিচিত। এর দুর্গম পাহাড়ি ভূ-প্রকৃতির কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সীমিত, ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
মঙ্গলবার র্যাব মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এখন ‘সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানা’তে পরিণত হয়েছে। গত ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালালে হামলার শিকার হয়। এতে একজন র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং তিনজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হামলার বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, অন্তত ৪০০–৫০০ জন মিলে র্যাবের দুটি মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে লাঠি ও অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করেছে। হামলাকারীরা র্যাবের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় এবং মসজিদের মাইকে গেট বন্ধের ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে গুলি চালায়। নিহত র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক ছিলেন।
র্যাব মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান জানিয়েছেন, হামলার দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং বিচারের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত র্যাব পুরো বিষয়টি মনিটর করবে। র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, হামলার পেছনে ‘রিদোয়ান গ্রুপ’-এর হাত রয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ১৫–২০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। এলাকার ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত তথ্য নিচের টেবিলে সংক্ষেপে দেওয়া হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| অবস্থান | সীতাকুণ্ড উপজেলা, চট্টগ্রাম |
| সীমান্ত | পূর্বে হাটহাজারী, দক্ষিণে বায়েজিদ থানা |
| এলাকা | প্রায় ৩,১০০ একর |
| বাড়ির সংখ্যা | ২০,০০০–২৫,০০০ |
| জনসংখ্যা | প্রায় ১–১.৫ লাখ |
| বসবাসকারী | দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছিন্নমূল ও মধ্যবিত্ত |
| নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী | ইয়াসিন গ্রুপ, রোকন গ্রুপ, রিদোয়ান গ্রুপ |
স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রশাসনের মতে, এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে থাকায় সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, পানি, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক সুবিধা থাকলেও নিরাপত্তার অভাবে এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় না। রাজনৈতিক ছত্রছায়া, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং ছিন্নমূল মানুষের ভরসা—এগুলো মিলে জঙ্গল সলিমপুরকে অপরাধীদের জন্য একটি ‘মানব ঢাল’ হিসেবে রূপ দিয়েছে।
র্যাব-৭ এর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, ভৌগোলিক কারণে অভিযান কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত সংখ্যক ফোর্স প্রয়োগ করলে জঙ্গল সলিমপুরে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তবে এর জন্য স্থানীয় জনগণ ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
এভাবে জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রামের একটি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে অব্যাহত রয়েছে, যেখানে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সঠিক তথ্য, পরিকল্পনা ও সাহসিকতার প্রয়োজন রয়েছে।