খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনে বীমা খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে এই খাতের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে গ্রাহকের দুঃসময়ে বীমা দাবির (Claim) দ্রুত ও স্বচ্ছ নিষ্পত্তির ওপর। বীমা কোনো সাধারণ পণ্য নয়; এটি মূলত একটি আর্থিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। যখন কোনো পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারায় কিংবা গুরুতর দুর্ঘটনায় পড়ে দিশেহারা হয়, তখন বীমা কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত অর্থই তাদের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বর্তমানে অতিরিক্ত ভেরিফিকেশন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেই ভরসার জায়গায় তৈরি হয়েছে চরম আস্থার সংকট।
যেকোনো বীমা দাবি পরিশোধের আগে নথিপত্র যাচাই করা একটি আইনি ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া। তবে অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি যুক্তিসঙ্গত সীমানা ছাড়িয়ে সময়ক্ষেপণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বৈধ রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তুচ্ছ অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। টাইপোগ্রাফিক ভুল বা ছোটখাটো তথ্যের অসঙ্গতিকে বড় করে দেখিয়ে দাবি নাকচ বা বিলম্বিত করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বলের গ্রাহকদের জন্য বারবার শহরে এসে নথিপত্র জমা দেওয়া বা সত্যায়ন করা কেবল ব্যয়বহুল নয়, বরং মানসিক যন্ত্রণারও কারণ।
বীমা বিক্রির সময় অনেক ক্ষেত্রে শর্তাবলি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয় না। অনেক সময় এজেন্টরা কেবল বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য গ্রাহককে পলিসির নেতিবাচক দিক বা সীমাবদ্ধতাগুলো জানান না। ফলে বিপদের সময় যখন দাবি উত্থাপন করা হয়, তখন ‘পলিসির আওতাভুক্ত নয়’—এমন অজুহাতে দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। এতে কেবল একজন গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং গোটা বীমা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নিচে বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে বিদ্যমান প্রধান সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধানের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিদ্যমান সমস্যা | প্রস্তাবিত সমাধান ও সংস্কার |
| নথিপত্র যাচাই | একই তথ্য বারবার চাওয়া ও অতিরিক্ত ভেরিফিকেশন। | নথিপত্রের একটি অভিন্ন ও সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন। |
| সময়সীমা | দাবি নিষ্পত্তিতে মাসের পর মাস অনিয়মিত অপেক্ষা। | নির্দিষ্ট কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করা। |
| স্বচ্ছতা | দাবি বাতিলের কারণ স্পষ্টভাবে না জানানো। | লিখিত ও যৌক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করা বাধ্যতামূলক করা। |
| প্রযুক্তি ব্যবহার | অ্যানালগ পদ্ধতিতে ফাইল ট্র্যাকিং। | ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড ও এসএমএস আপডেট সেবা চালু। |
| পেশাদারিত্ব | বিক্রির সময় শর্তাবলি গোপন রাখা। | গ্রাহককে সহজ ভাষায় শর্ত বুঝিয়ে বলা ও ভিডিও রেকর্ড রাখা। |
বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে সেবামুখী সংস্কার এখন সময়ের দাবি। প্রথমত, প্রতিটি বীমা কোম্পানির উচিত একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা, যাতে গ্রাহক ঘরে বসেই তার দাবির বর্তমান অবস্থা জানতে পারেন। দ্বিতীয়ত, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (IDRA) তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। যদি কোনো কোম্পানি যৌক্তিক কারণ ছাড়া দাবি নিষ্পত্তিতে দেরি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
পরিশেষে, বীমা খাতের সম্প্রসারণ কেবল বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে গ্রাহকের আস্থার ওপর। ক্লেইম সেটেলমেন্টকে জটিল আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে একটি মানবিক সেবা হিসেবে গ্রহণ করলেই দেশের বীমা খাত আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে।