আবু আলম মো. শহিদ খান
প্রকাশ: 25শে চৈত্র ১৪৩১ | ৮ই এপ্রিল ২০২৫ | 1149 Dhu al-Hijjah 5
আজ অনেক জায়গা থেকে বাটা শু এর বিভিন্ন ব্রাঞ্চে ভাঙচুর ও লন্ঠনের খবর আসছে। খুব হতাশা নিয়ে খবরগুলো পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিল একজন মানুষের কথা। ভদ্রলোকের নাম উইলিয়াম এ এস ওডারল্যান্ড, ১৯৭১ সালে বাটা শু কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার। একজন ডাচ্-অস্ট্রেলিয়ান কমান্ডো অফিসার। সেই সাথে মনে পড়ছে বাটা শু কোম্পানিতে কর্মরত তার শত শত সহযোদ্ধার কথা।
১৯৭০ সালের শেষ দিকে ওডারল্যান্ড ঢাকায় বাটা শু কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে প্রথম ঢাকায় আসেন। তিনি ছিলেন একজন প্রাক্তন-সৈনিক। সচেতন মানুষ হিসেবে তিনি সবদিকে নজর রাখতেন। এ ছাড়া ভালো মানুষ হিসেবে এ দেশি কর্মচারীদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। অপারেশন সার্চলাইটের সময় তিনি লুকিয়ে সে রাতের ভয়াবহতার কিছু ছবি তুলে পাঠান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। এই সাবেক যোদ্ধার মধ্যে বাঙালির নিপীড়ন দেখে যোদ্ধাসত্তা আবার জেগে ওঠে। রাতারাতি এই যুদ্ধ তাঁর হয়ে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় সৈনিক। তার অনুপ্রেরণায় বাটা শু কোম্পানির অনেক কর্মীরাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আগস্ট মাসের দিকে তিনি টঙ্গীতে বাটা কোম্পানির ভেতরে গেরিলা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি চালাতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য-ওষুধ এবং আশ্রয় দেওয়ার কাজ। টঙ্গী ও এর আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা হামলার আয়োজকও ছিলেন তিনি। এই পুরো যুদ্ধের সময়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকজন ভাই, বিশ্বস্ত কমরেড।
শুধু এ দেশের স্বাধীনতার জন্য আর নিরীহ মানুষকে হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে নিজের মানবিক তাড়নাতেই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে লড়তে থাকেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। আর এভাবেই তিনি বাঙালির প্রাণের বন্ধু হয়ে ওঠেন। একজন বিদেশি হয়েও শুধুমাত্র মানবতার জন্য, আমাদের জন্য জীবন বাজি রাখার এমন মানুষ বিরল।
মুক্তিযুদ্ধে এ বীরোচিত ভূমিকা রাখার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিবিজড়িত কোম্পানির নাম বাটা শু কোম্পানি। সেই সূত্রে বাটা শু কোম্পানি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের একটি সম্মানিত স্টেকহোল্ডার। প্রতিবার যখন বাটা শু এর কোনো স্টোরে কেনাকাটা করতে গিয়েছি, তার কথা মনে পড়েছে, মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী অবদান রাখার জন্য বীরপ্রতীক প্রাপ্ত ওডারল্যান্ড ছিলেন একজন যোদ্ধা। তিনিই একমাত্র বিদেশি যিনি এই রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতি অপরিমেয় ভালোবাসার জন্য বাঙালি জাতির কাছে তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার গুলশানের একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৭৮ সালে ওডারল্যান্ড বাটা শু কোম্পানি থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসেন। ১৮ মে ২০০১ সালে, তিনি পার্থের একটি হাসপাতালে মারা যান।
আরেকটি বিষয় সবার অবগতির জন্য জানাতে চাই। বাটা কিন্তু ইজরায়েলের কোম্পানি নয়। এমনকি কোন বড় ধনকুবের কোম্পানি নয়। বাটার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন টোমাস বাটা (Tomáš Baťa, চেক ভাষায় উচ্চারণ: [ˈtomaːʃ ˈbata])। টোমাস বাটার পরিবার সুদূর অতীত হতে মুচির পেশায় নিয়োজিত ছিল। বাটা কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৪ সালে, তদানীন্তন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের য্লিন (Zlín) শহরে (বর্তমানে এটি চেক প্রজাতন্ত্রের অন্তর্গত)।
বাটা পরে একটি বহুজাতিক জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। এর প্রধান কার্যালয় সুইজারল্যান্ডের লুসানে অবস্থিত। ৫০টিরও অধিক দেশে বাটা কোম্পানির শাখা রয়েছে। ২৬টি দেশে বাটার জুতা তৈরির কারখানা রয়েছে।
টোমাস বাটা জুতা তৈরির কারিগর হলেও তিনি মানসিকতায় ছিলেন একজন অত্যন্ত উন্নত মানুষ। তিনি সমাজ সচেতনতা ও মানুষের উন্নতির ভাবনার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি তার কর্মীদের জন্য বাসস্থান, সিনেমা হল, এবং অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা করেন।
টোমাস বাটার মতো একজন মানুষের প্রতিষ্ঠান, যার সাথে আবার মুক্তিযোদ্ধা ওডারল্যান্ড এর স্মৃতি জড়িত, সেই প্রতিষ্ঠানের এই দশা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমন খারাপ খবর প্রতিদিন দেখতে ইচ্ছে করে না।
লেখক: সাবেক সচিব