খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নূর আলম। ক্ষুধা মেটাতে বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় ক্যাম্পাসের টং দোকানে বসে চায়ের সঙ্গে খান বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া। খাওয়ার সময় ভালো লাগলেও পরে পেটে অস্বস্তি অনুভব করেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন এ ধরনের ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার ফলে তাঁদের খাবারে অরুচি দেখা দেয় এবং পেটব্যথা, বুক জ্বালাপোড়া, গ্যাস্ট্রিকসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগতে হয়।
ক্যাম্পাসে ভাজাপোড়ার চিত্র
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ভার্সিটি গেট, মদিনা মার্কেট, সুরমা আবাসিক এলাকা, টিলারগাঁও, আখালিয়া, কুমারগাঁও, তেমুখী ও পাঠানটুলা এলাকায় সময় কাটান। এসব আড্ডায় চায়ের সঙ্গে পুরি, শিঙারা, সমুচা, পেঁয়াজু, বেগুনি, পাকোড়াসহ নানা তেলেভাজা খাবার খাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে সোনার বাংলা, বিসমিল্লাহ রেস্টুরেন্ট কিংবা রাস্তার পাশের ভাসমান দোকান থেকেই এসব খাবার কেনেন শিক্ষার্থীরা।
দোকানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব দোকানে ভাজাপোড়ার জন্য একই তেল ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। বারবার ব্যবহারে তেল যখন একেবারে কালচে হয়ে যায়, তখন সেটি ফেলে দেওয়া হয়।
‘মবিল’ অবস্থায় পৌঁছানো পর্যন্ত ব্যবহৃত হয় তেল
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী মোজাম্মিল ইসলাম একই তেলের পুনর্ব্যবহার নিয়ে একটি গবেষণা করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন পাঠানটুলা, মদিনা মার্কেট, আখালিয়া, কুমারগাঁও ও তেমুখী এলাকার ৩৫টি দোকান থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ১৬টি রেস্টুরেন্ট, ৬টি টং দোকান ও ১৩টি ভাসমান দোকান থেকে নমুনা নেওয়া হয়। পাশাপাশি ১৩ জন খাবার ব্যবসায়ী, ১৩ জন দোকান তত্ত্বাবধায়ক, ৬ জন ব্যবস্থাপক ও ১৩ জন পাচকের সাক্ষাৎকার নেন।
মোজাম্মিল ইসলাম জানান, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশের বেশি নমুনায় একই তেল পাঁচ থেকে ছয়বারের বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তেল যখন অতিরিক্ত কালো হয়ে ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, তখন দোকানদাররা সেটিকে “মবিল” বলে থাকেন। এরপরই তা ফেলে দেওয়া হয়। অনেকেই আগের দিনের ব্যবহৃত তেলের সঙ্গে নতুন তেল মিশিয়ে আবার ব্যবহার করেন, যা বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) নির্ধারিত মান অনুযায়ী তেলে পোলার যৌগের (টিপিসি) মাত্রা তাজা অবস্থায় ৫–৭ শতাংশ থাকে। একবার ভাজা হলে তা বেড়ে ১০–১২ শতাংশ হয়। পাঁচবার ভাজার পর এটি ২৫–৩০ শতাংশে পৌঁছায়, যা মানুষের জন্য অনিরাপদ বলে বিবেচিত।
স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে অজানা সচেতনতা
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল ও চা প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মোজাম্মেল হক বলেন, একই তেলে বারবার ভাজা খাবার খাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের হৃদ্রোগ, ক্যানসার, আলসার, গ্যাস্ট্রিকসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এসব খাবার শরীরের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বার্ধক্য দ্রুত বাড়িয়ে তোলে।
গবেষণাকারী মোজাম্মিল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ দোকানদার তেলের পুনর্ব্যবহার বা তার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন নন। সরকারি কোনো নির্দেশিকা তাঁদের কাছে নেই। শিক্ষার্থীদের সচেতনতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উচিত নিয়মিত তদারকি ও দোকানিদের সচেতন করা।
খবরওয়ালা/টিএসএন