খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
রাজধানী ঢাকার রাজপথ এখন যেন দাবি আদায়ের প্রধান ক্ষেত্র। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গোষ্ঠীর আন্দোলনের মুখে স্থবির হয়ে পড়ছে মেগাসিটির চাকা। সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা সেবা ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গত বুধবার সাত কলেজের জন্য পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সহপাঠী হত্যার বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের ফলে সৃষ্ট নজিরবিহীন যানজট এই সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
গণমাধ্যমকর্মী সৈয়দ আবিদ হুসাইন সামি বুধবার দাপ্তরিক প্রয়োজনে ঢাকা ছাড়ার কথা ছিল। আজিমপুরের বাসা থেকে নির্ধারিত সময়ে বের হলেও শাহবাগ মোড় পার হতে তার সময় লাগে আড়াই ঘণ্টারও বেশি। সড়ক অবরোধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি অন্তত ২০টি অ্যাম্বুলেন্স দেখেছি যেগুলোর সাইরেন বাজছিল কিন্তু যাওয়ার কোনো পথ ছিল না।” সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন চিত্রে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ ও চালকেরা আন্দোলনকারীদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন।
বুধবার রাজধানীর অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেওয়ায় মিরপুর, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব ও বনানীসহ প্রায় পুরো শহর অচল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এবং শিক্ষার্থী সাকিবুল হত্যার বিচার নিয়ে ক্ষোভ রাজপথ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
সড়ক অবরোধের প্রধান কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| আন্দোলনের বিষয় | মূল দাবি | প্রধান কেন্দ্রসমূহ | জনজীবনের প্রভাব |
| সাত কলেজ সংস্কার | পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি। | শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব। | পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার পূর্ণ বিপর্যয়। |
| সাকিবুল হত্যা বিচার | দায়ীদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ। | আজিমপুর, ধানমন্ডি। | স্কুল ও অফিসগামীদের চরম দুর্ভোগ। |
| জরুরি সেবা বিঘ্ন | মুমূর্ষু রোগীর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো। | রাজধানীর প্রধান মোড়। | অ্যাম্বুলেন্স আটকে প্রাণহানির ঝুঁকি। |
| পেশাজীবী আন্দোলন | চাকরি জাতীয়করণ ও বকেয়া বেতন। | জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকা। | দীর্ঘস্থায়ী যানজট ও অর্থনৈতিক ক্ষতি। |
বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, দাবি আদায়ের জন্য সড়ক অবরোধ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এর পেছনে তারা সরকারের প্রশাসনিক ধীরগতি ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও যথাযথ সাড়া না পেয়ে বাধ্য হয়ে রাজপথে নামছে। যখনই সড়ক অবরোধ করা হয়, তখনই কেবল কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে—এই সংস্কৃতিই মূলত সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামতে উৎসাহিত করছে।
বিনা বাধায় সড়ক অবরোধের এই প্রবণতা বন্ধ না হলে অচিরেই ঢাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের উচিত অভিযোগ শোনার জন্য একটি শক্তিশালী এবং দ্রুত কার্যকরী সেল গঠন করা, যাতে সড়ক অবরোধের আগেই দাবিগুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করা যায়। একই সাথে সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে আইনি কঠোরতাও জরুরি।
দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যে হুঁশিয়ারি শিক্ষার্থীরা দিয়েছেন, তাতে সামনের দিনগুলোতে জনভোগান্তি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনের তড়িৎ পদক্ষেপই কেবল পারে ঢাকাবাসীকে এই রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে।