খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: 30শে পৌষ ১৪৩২ | ১৩ই জানুয়ারি ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নেদারল্যান্ডসের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হুবহু নকল বা ‘ক্লোন’ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি প্রতারক চক্রের মূল হোতাসহ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি, ২০২৬) সিআইডির পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়। জামালপুর সদর থানার স্টেশন রোড এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও অভিযান
সিআইডির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন চক্রের মূল হোতা হৃদয় হাসান (২১) এবং তাঁর সহযোগী তৌহিদ ভূঁইয়া (২১)। গত বুধবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রথমে তৌহিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই এলাকা থেকে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করে সিআইডির একটি চৌকস দল।
প্রতারণার কৌশল ও প্রযুক্তির অপব্যবহার
এই চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পর্যটন ও আতিথেয়তা প্রতিষ্ঠান ‘উইথলোকালস’ (Withlocals)-এর ওয়েবসাইটটি ক্লোন করে। তারা একই নাম, লোগো এবং ডিজাইন ব্যবহার করে একটি ভুয়া ওয়েবপেজ তৈরি করে। এরপর টেলিগ্রাম গ্রুপ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিদেশি কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উচ্চ মুনাফা বা লভ্যাংশের প্রলোভন দেখাত। চক্রটি নিজেদের ওই বিদেশি কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করত।
নিচে এই প্রতারক চক্রের কার্যক্রম এবং সিআইডি কর্তৃক জব্দ করা তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
|---|---|
| নকলকৃত প্রতিষ্ঠান | উইথলোকালস (নেদারল্যান্ডস)। |
| মূল হোতা | হৃদয় হাসান (বয়স ২১ বছর)। |
| গ্রেপ্তারের স্থান | স্টেশন রোড, জামালপুর সদর। |
| নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক হিসাব | বিভিন্ন ব্যক্তির নামে খোলা ৩০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। |
| ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট | ২ টি বাইনান্স (Binance) ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্ট। |
| প্রতারণার মাধ্যম | টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং ক্লোন ওয়েবসাইট। |
| প্রাথমিক অভিযোগ | এক ভুক্তভোগীর ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ। |
| জব্দকৃত সরঞ্জাম | স্মার্টফোন, ডিজিটাল ডিভাইস ও কিউআর কোড। |
ডিজিটাল ফরেনসিক ও আর্থিক তথ্য
সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল হোতা হৃদয় হাসান অত্যন্ত চতুরতার সাথে অন্যের নামে খোলা প্রায় ৩০টি ব্যাংক হিসাব নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁর স্মার্টফোন থেকে ১৫টি কিউআর কোড উদ্ধার করা হয়েছে, যা ব্যবহার করে তিনি একাধিক টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে লগইন করে প্রতারণা চালাতেন। শুধু তাই নয়, অন্যের নামে খোলা দুটি বাইনান্স (ক্রিপ্টোকারেন্সি) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তিনি অর্থ লেনদেন করতেন, যেগুলোর সাথে তাঁর নিজস্ব বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত ছিল। এতে পাচারকৃত অর্থের উৎস লুকিয়ে রাখা সহজ হতো।
রাজধানীর পল্টন থানায় এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলার সূত্র ধরে সিআইডি এই অনুসন্ধান চালায়। ওই ভুক্তভোগী একাই প্রায় ২৫ লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন। সিআইডি আশঙ্কা করছে, এভাবে দেশের শত শত মানুষের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রটি।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, এই চক্রের সাথে আর কারা জড়িত এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ কোথায় পাচার করা হয়েছে, তা বিস্তারিত জানতে গ্রেপ্তারকৃতদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অর্থপাচার সংক্রান্ত বিষয়ে সিআইডির তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। সাধারণ মানুষকে যেকোনো অপরিচিত বিদেশি ওয়েবসাইটে বিনিয়োগের আগে তার সত্যতা যাচাই করার জন্য কঠোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।