খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
‘লিবিয়ায় আমাদের দিনের পর দিন বেঁধে রাখা হতো, লোহার রড দিয়ে পেটানো হতো। খাবার দেওয়া হতো না। নির্যাতনের ভিডিও পরিবারে পাঠিয়ে আদায় করা হতো মুক্তিপণ। মৃত ভেবে একপর্যায়ে মরুভূমিতে ফেলে রেখে গিয়েছিল তারা। কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক আমাদের উদ্ধার করেন। দেশে ফিরতে পারব, তা কখনো কল্পনাও করিনি।’ — সম্প্রতি লিবিয়া থেকে ফিরে আসা তানজির শেখ এমনই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। কষ্টের টাকায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েও টর্চার সেলে আটকে থাকতে হয়েছে। মধ্যযুগীয় কায়দায় চলেছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। বিদেশে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখে পাচারকারী চক্র। এরপর পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। সর্বশেষ লিবিয়া থেকে এভাবে বন্দি থাকা ১৭৬ জনকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফরম) শরিফুল হাসান বলেন, ‘মানুষ যে শুধু অর্থের কারণে অবৈধপথে বিদেশ যান তা নয়, আসল কারণ তারা দেশ ছাড়তে চান। দেশে কর্মসংস্থান ও সুশাসন না থাকলেই মানুষ অবৈধ অভিবাসনে উদ্বুদ্ধ হয়। সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খুঁজতে হবে, নইলে এই সংকট কোনোদিনই মিটবে না।’ লিবিয়ায় মানবপাচারের শিকার হয়ে দীর্ঘ নয় মাস পর ৯ জুলাই দেশে ফেরেন ঝিনাইদহের মতিউর রহমান সাগর, কুষ্টিয়ার তানজির শেখ ও নোয়াখালীর আলমগীর হোসেন। তাদের সঙ্গে একই ফ্লাইটে ফিরেছেন ১৭৬ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে বেনগাজীর গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার থেকে ১৪১ জন ও ত্রিপলীর তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার থেকে ৩৫ জন মুক্তি পান।
দেশে ফিরে তানজির শেখ জানান, ২০২৩ সালে দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে ৪ লাখ টাকা খরচ করে লিবিয়ায় যান। ইতালিতে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে দালালরা তাদের লিবিয়ায় পাঠায়। সেখানে পৌঁছে পাচারকারীরা তাদের ভয়ংকর মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। ত্রিপলিতে আরও ৮০ বাংলাদেশির সঙ্গে মাসের পর মাস আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় শেষে মৃত ভেবে মরুভূমিতে ফেলে রাখা হয়। সেখান থেকে মৃতপ্রায় অবস্থায় কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসা ও আশ্রয় দেন।
বিদেশ ফেরতদের জরুরি সহায়তায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত আট বছর ধরে কাজ করছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক, এপিবিএনসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় এ সময়ের মধ্যে ৩৭ হাজারের বেশি মানুষকে সহায়তা করা হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪০ জন প্রবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘অবৈধ অভিবাসনের পেছনে দেশি-বিদেশি চক্র কাজ করছে। কোনো একটি দেশের পক্ষে একা এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যে বিমানবন্দরগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোতে সমন্বিত নজরদারি জরুরি। শুধু বাংলাদেশ নয়, আরও অনেক দেশ এই চক্রের শিকার।’
ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, অবৈধভাবে ইউরোপগামীদের ৯৩ শতাংশ ক্যাম্পে আটক হন এবং ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ইউরোপের সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যানুযায়ী, লেবানন হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেন। ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এই রুটে প্রায় ৭০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে ঢুকেছেন। ব্র্যাকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লিবিয়া ফেরত ৫৫৭ জনের মধ্যে ৬০ শতাংশ পরিবার স্থানীয় দালালদের প্রলোভনে পড়েছিলেন, আর ৮৯ শতাংশ নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নযাত্রা মৃত্যুযাত্রায় পরিণত না হয়, এজন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন।
৭০ লাখ টাকায় মুক্তি : ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন মুন্সীগঞ্জের রিপন শিকদার ও গাজীপুরের মাসুম মোল্লা। কিন্তু প্রতারণার শিকার হয়ে লেবাননে পাচার হন তারা। ক্যাম্পে আটক রেখে শুরু হয় দুঃসহ নির্যাতন। জিম্মি করে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারে পাঠিয়ে আদায় করা হয় প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এরপরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। অবশেষে ব্র্যাক ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের যৌথ উদ্যোগে মুক্তি পান তারা। গত ২১ জুন লিবিয়ার ত্রিপোলি থেকে দেশে ফেরেন তারা। দুই ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মোজাম্মেল, নওশাদ, নজরুল, সোহাগ ও হাওলাদার ট্রাভেলস কোম্পানির মালিকরা এই পাচারচক্রের মূল হোতা।
ইতালি, গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে ফিরল ২৯ জন : বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এবং অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতালি, গ্রিস ও সাইপ্রাস থেকে ২৯ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জন ইতালি, ৯ জন গ্রিস ও ৪ জন সাইপ্রাস থেকে ফিরেছেন। এদের মধ্যে দোহারের হাসান খান জানান, পাঁচ বছর আগে গ্রিসে গিয়েছিলেন। দালালদের কাছে সাড়ে ১০ লাখ টাকা দিয়ে সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করেছিলেন। অবশেষে ঋণ শোধ করতে না করতেই দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
সরকারি তথ্যমতে, গত দেড় বছরে আমেরিকা, লিবিয়া ও ইউরোপ থেকে শত শত বাংলাদেশি ফেরত এসেছেন। ২০২৪ সালের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১৮৭ জনকে আমেরিকা ফেরত পাঠিয়েছে। গত ২ আগস্ট একটি মার্কিন সি-১৭ সামরিক বিমানে ৩৯ জন বাংলাদেশিকে পাঠানো হয়। ৮ জুন চার্টার্ড ফ্লাইটে ফেরত আসেন ৪২ জন। ৬ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিলের মধ্যে আরও ৩৪ জন ফেরত এসেছিলেন। ২১ আগস্ট ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যেতে ব্যর্থ হওয়া ১৭৬ জনকে লিবিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা হয়।
ভয়ংকর সমুদ্রপথের রুট : বৈধপথে ইতালি যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা আশ্রয় নেন আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের কাছে। এসব চক্র বাংলাদেশ থেকে বিদেশগামীদের প্রথমে দুবাই পাঠায়। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় তুরস্ক বা মিসরে। সেখান থেকে আবার পাঠানো হয় লিবিয়ায়। পরবর্তীতে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইতালি পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।
লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার তিনটি ধাপ জনপ্রিয় হলেও ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে অভিবাসীদের একটি দলে ঢোকানো হয় এবং সাগরে কম্পাস ধরে দিক নির্ণয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে লিবিয়ার জোয়ারা ও তাজোরা উপকূল থেকে যাত্রা শুরু হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিবাসীরাই নৌকা চালান। দালালরা সাগরে আর থাকে না। ভাগ্য নির্ভর করে অভিবাসীদের হাতে। দিক ভুল হলে নৌকা চলে যায় মাল্টায়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে আবার লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। অনেকেই দিক নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়ে সলিলসমাধি হন বা ভেসে থাকেন। অনেক সময় তাদের কোস্ট গার্ড সদস্যরা লিবিয়া বা তিউনিসিয়ার বন্দরে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে অপেক্ষা করে অন্ধকার কারাগার।
খবরওয়ালা/টিএসএন