খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
কাগজে কলমে পদবি ‘অফিস সহকারী’ কিন্তু বাস্তবে শিক্ষক। জীবনের টানা ২৭ বছর বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। তবে মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় অবসরে গিয়েও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পাননি। জীবনের প্রয়োজনে এখন রাত জেগে বাজার পাহারা দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।
তিনি হলেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার টোকরাভাষা ইসলামিয়া একরামিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার পরিচিত মুখ মো. তোহিদুল ইসলাম (৭৩), যাকে সবাই ‘সোনা মাস্টার’ নামে চেনে।
তোহিদুল ইসলাম দেবীগঞ্জ উপজেলার চিলাহাটি ইউনিয়নের টোকরাভাষা এলাকার মৃত তসির উদ্দীনের ছেলে। ১৯৮৭ সালে মাদরাসার ইবতেদায়ী শাখায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে মাদরাসাটি দাখিল শাখার অনুমতি পেলে অফিস সহকারী পদে নিয়োগ পান। তবে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত ক্লাসও চালিয়ে গেছেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি শিক্ষাদান করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।
মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় ২৭ বছর বেতন পাননি। ২০১৪ সালে অবসরে গেলেও কোনো সুবিধা পাননি। বর্তমানে তিনি স্থানীয় টোকরাভাষা বাজারে নাইটগার্ড হিসেবে কাজ করছেন, দৈনিক আয় মাত্র ১৫০ টাকা, যা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।
তোহিদুল ইসলাম বলেন, জীবনের সোনালি সময়টা মাদরাসার জন্য দিয়েছি। কোনো বেতন পাইনি, অবসরে গিয়েও কিছু পেলাম না। এখন রাত জেগে বাজার পাহারা দিয়ে সংসার চালাই।
মাদরাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে টোকরাভাষা ইসলামিয়া একরামিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসার যাত্রা শুরু হয় ইবতেদায়ী শাখা দিয়ে। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। প্রতিবছর ১৫–২০ জন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেন। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৮ জন। তাদের সবার জীবন অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা জানান, ‘সোনা মাস্টার’ ছিলেন তাদের প্রিয় শিক্ষক।
৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুন বলেন, স্যার অবসরে গেছেন, তবুও এখনো মাদরাসায় এসে ক্লাস নেন। আমাদের খুব যত্নসহকারে পড়ান। তিনি শুধু শিক্ষক নন, অভিভাবকের মতো।
সাবেক শিক্ষার্থী আয়শা সিদ্দীকা বলেন, আমাদের এলাকায় যারা কিছু ভালো জায়গায় গেছে, সবার পেছনে সোনা স্যারের হাত আছে। অথচ এখন তিনি নাইটগার্ডের কাজ করছেন, এটা আমাদের জন্য কষ্টের ও লজ্জার।
স্থানীয় অভিভাবক আনছারুল বলেন, এত বছর বিনা বেতনে একজন মানুষ কীভাবে শিক্ষাদান চালিয়ে গেলেন, সেটাই বিস্ময়ের বিষয়। সরকার যদি দ্রুত মাদরাসাটিকে এমপিওভুক্ত না করে, শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে পড়বে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি মোশাররফ হোসেন বলেন, সোনা মাস্টার শুধু শিক্ষক নন, তিনি এলাকার একজন আদর্শ মানুষ। বর্তমানে তিনি বাজারে নাইটগার্ড হিসেবে কাজ করছেন। তার প্রাপ্য সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা তিনি কোনোদিন পাননি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
টোকরাভাষা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি কামাল মোস্তাহারুল হাসান নয়ন বলেন, সোনা মাস্টার আমাদের বাজারের নাইটগার্ড হিসেবে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেন। বয়স হলেও তিনি দায়িত্বশীল মানুষ। আমরা বণিক সমিতির পক্ষ থেকে তার পাশে থাকার চেষ্টা করছি। সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন যদি এমন মানুষের প্রতি নজর দেয়, সমাজ উপকৃত হবে।
মাদরাসাটির ভারপ্রাপ্ত সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাদরাসাটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে আমরা সরকারের কাছে আবেদন করছি, কিন্তু এখনও আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না।
দেবীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) সাইফুল ইসলাম বলেন, টোকরাভাষা ইসলামিয়া একরামিয়া মহিলা দাখিল মাদরাসা দীর্ঘদিন ধরে এমপিওবহির্ভূত। সোনা মাস্টার বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, এটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
খবরওয়ালা/শরিফ