খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বিরল স্নায়বিক রোগ মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত এক নারী সফলভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। চিকিৎসকদের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৩ মে অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান) মাধ্যমে তিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে মা ও নবজাতক উভয়েই সুস্থ রয়েছেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
এই রোগে আক্রান্ত তানিয়া খাতুন গর্ভধারণের খবর জানার পর শুরু থেকেই ছিলেন বিশেষ চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে। বিষয়টি জানার পর রামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাকে নিয়মিত তত্ত্বাবধানে রাখেন। গর্ভধারণের প্রথম মাসেই তিনি চিকিৎসকদের অবহিত করেন এবং পুরো গর্ভকালজুড়ে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন।
তানিয়া খাতুনের স্বামী জেবর আলী জানান, প্রায় ১০ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তানিয়ার শারীরিক জটিলতা শুরু হলে প্রথমে চোখ লাল হওয়া ও পরবর্তীতে দ্বৈত দৃষ্টি (এক জিনিসকে দুটি দেখা) দেখা দেয়। প্রথমদিকে তারা বিষয়টি সাধারণ সমস্যা মনে করলেও পরে অবস্থা খারাপ হলে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা ও কবিরাজের পরামর্শ নেওয়া হয়। তবে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
রামেক হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে তিনি বিরল স্নায়বিক রোগ মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলভাবে স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে আক্রমণ করে। ফলে মস্তিষ্ক থেকে পেশিতে সংকেত সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না এবং মারাত্মক পেশিশক্তি দুর্বলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
রোগ নির্ণয়ের পর তানিয়াকে দীর্ঘ সময় আইসিইউতে চিকিৎসা নিতে হয়। মোট ২১ দিন তিনি আইসিইউতে ছিলেন এবং প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন। এ সময় চিকিৎসকরা পাঁচবার তার রক্তরস (প্লাজমা) পরিবর্তনের চিকিৎসা দেন। চিকিৎসকদের ভাষায়, এটি এক ধরনের প্লাজমা এক্সচেঞ্জ প্রক্রিয়া, যেখানে রোগীর শরীর থেকে ক্ষতিকর অ্যান্টিবডিযুক্ত প্লাজমা অপসারণ করে নতুন প্লাজমা দেওয়া হয়। ব্যয়বহুল ইমিউনোগ্লোব্যুলিন ওষুধের বিকল্প হিসেবে এই চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়। হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপকদের পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়।
চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং লাইফ সাপোর্ট থেকে তাকে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়। পরবর্তীতে তিনি নিউরো ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত হন। চিকিৎসকরা তাকে সতর্ক করে জানান, ভবিষ্যতে গর্ভধারণ তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং সন্তানের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
এরপর গর্ভধারণের বিষয়টি নিশ্চিত হলে পরিবারটি দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকরা—নিউরোলজি, মেডিসিন ও গাইনি—সমন্বিতভাবে তার চিকিৎসা পরিচালনা করেন।
চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, এমন জটিল রোগে আক্রান্ত অবস্থায় গর্ভধারণ এবং সফল প্রসব অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তার মতে, রোগীর অবস্থা বিবেচনায় একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম—গাইনি, অ্যানেসথেসিয়া, মেডিসিন, নিউরোলজি ও আইসিইউ বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
তানিয়ার স্বামী জেবর আলী বলেন, চিকিৎসকেরা শুরুতেই জানিয়েছিলেন গর্ভধারণ ঝুঁকিপূর্ণ, এমনকি সন্তানের জীবনহানির সম্ভাবনাও থাকতে পারে। তবে তারা গর্ভপাত না করে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে গর্ভকাল সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। পুরো সময়জুড়ে তিনি ও তার পরিবার চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
৩ মে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তানিয়া কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। চিকিৎসকদের মতে, অস্ত্রোপচারটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে একটি সফল সমন্বিত চিকিৎসা প্রক্রিয়ার ফল। বর্তমানে মা ও শিশু সুস্থ রয়েছে।
জেবর আলী আরও জানান, তিনি তার নবজাতকের নাম এখনও নির্ধারণ করেননি এবং চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামালের পরামর্শ অনুযায়ী নাম রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাদের আরও একটি আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে।
রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ঘটনা তাদের জন্য একটি দলগত চিকিৎসা সাফল্য। দীর্ঘমেয়াদি আইসিইউ সাপোর্ট থেকে শুরু করে গর্ভকালীন ব্যবস্থাপনা এবং সফল প্রসব—সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন বিভাগের সমন্বিত ভূমিকা ছিল। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের জটিল রোগীর সফল গর্ভধারণ ও প্রসব রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।