খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের বীমা খাতে এক নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কর্তৃক ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়ন ফি এক লাফে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং সেই বর্ধিত ফি বকেয়া হিসেবে আদায়ের নির্দেশকে কেন্দ্র করে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে। সংশ্লিষ্টরা এই সিদ্ধান্তকে বীমা আইন-২০১০ এবং প্রচলিত আর্থিক বিধিমালার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ও “স্বেচ্ছাচারী” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সাধারণত বীমা কোম্পানিগুলো পরবর্তী বছরের ব্যবসায়িক নিবন্ধনের জন্য আগের বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ফি পরিশোধ করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ফি কোম্পানিগুলো ২০২৫ সালের শেষভাগেই পরিশোধ সম্পন্ন করেছে। কিন্তু গত ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকার ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা-২০১২’ অধিকতর সংশোধন করে একটি নতুন গেজেট প্রকাশ করে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আইডিআরএ এই সংশোধিত বিধিমালার আলোকে কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত ফি পরিশোধের নির্দেশ দেয়।
বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা আইন-২০১০ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুতাপেক্ষা (Retrospective) বা অতীতে কার্যকর হওয়া কোনো আইনের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের এখতিয়ার নেই। যেখানে কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে আইন মেনে নির্ধারিত সময়ে ফি জমা দিয়ে নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করেছে, সেখানে সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর নতুন বিধিমালা চাপিয়ে দেওয়া আইনত বৈধ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর ভিত্তি করে নিবন্ধন নবায়ন ফি’র হার ধাপে ধাপে বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে:
| সময়কাল | প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামে ফি (সংশোধিত) | পূর্ববর্তী ফি’র হার |
| ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সাল | ২ টাকা ৫০ পয়সা | ১ টাকা |
| ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সাল | ৪ টাকা | ১ টাকা |
| ২০৩২ সাল ও পরবর্তী সময় | ৫ টাকা | ১ টাকা |
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, বীমা কোম্পানিগুলোর বার্ষিক ব্যয়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। ২০২৫ সালে যে খরচ কোম্পানিগুলো তাদের হিসাবের খাতায় দেখিয়ে ফেলেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে নতুন করে সেই পুরনো বছরের খরচ সমন্বয় করা অ্যাকাউন্টিং পদ্ধতির পরিপন্থী।
বিআইএফ-এর সেক্রেটারি জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শফিক শামীম পিএসসি জানান, ২০২৬ সালের জন্য পূর্বের হারেই নিবন্ধন সনদ নবায়ন করা উচিত। যদি ফি বাড়াতেই হয়, তবে তা ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করা যৌক্তিক হতে পারে। জেনিথ ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী এস এম নুরুজ্জামান এবং এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী ইমাম শাহীনও একই সুরে কথা বলেছেন। তাদের মতে, এই বর্ধিত হার কোম্পানিগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে এবং শেষ পর্যন্ত বীমা গ্রাহকদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিতর্কিত ‘দুয়ার সার্ভিস লিমিটেড’-এর বকেয়া বিল পরিশোধের অভ্যন্তরীণ চাপের কারণেই আইডিআরএ নিবন্ধন ফি বাড়ানোর এই বিতর্কিত পথে হাঁটছে। অনেক কোম্পানি দাবি করেছে যে, তাদের ওপর মৌখিকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং বর্ধিত ফি পরিশোধ না করলে নিবন্ধন সনদ আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করা অবৈধ হওয়ায় কোম্পানিগুলো এখন এক ধরণের প্রশাসনিক জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে।
পরিশেষে, বীমা খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং আইনি জটিলতা এড়াতে আইডিআরএ-কে কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বীমা খাতের এই সংকট নিরসনে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।