খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
বীমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও এর আর্থিক সুফল পুরোপুরি অর্জনে এখনো কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মূলত পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থা (legacy systems), বিচ্ছিন্ন ডেটা কাঠামো এবং অপূর্ণ ডিজিটাল সংহতকরণ এআই-এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান Boston Consulting Group-এর মার্চ মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রপার্টি অ্যান্ড ক্যাজুয়ালটি (P&C) বীমা খাতে এআই বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, এই খাতে এআই বিনিয়োগ ২০২৬ সালের মধ্যে মোট আয়ের প্রায় ১.৯ শতাংশে পৌঁছাবে, যা গত বছরের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। এই প্রবণতা বীমা শিল্পে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের গতি ত্বরান্বিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যেসব বীমা প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তিকে শুধু নির্দিষ্ট কিছু বিভাগে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো কার্যক্রমে গভীরভাবে একীভূত করতে পারবে, তারা উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা অর্জন করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত পরিচালন ব্যয় হ্রাস এবং মোট লিখিত প্রিমিয়াম (Gross Written Premium) সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি। অর্থাৎ, এআই শুধু দক্ষতা নয়, সরাসরি আয় বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলো এআই ব্যবহার করছে মূলত আন্ডাররাইটিং, দাবি (claim) প্রক্রিয়াকরণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জালিয়াতি শনাক্তকরণের মতো ক্ষেত্রে। এসব ব্যবহারের মাধ্যমে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করা, মূল্য নির্ধারণের নির্ভুলতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত জালিয়াতি চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এসব প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় সামগ্রিক ব্যবসায়িক প্রভাব সীমিত থেকে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি পৃথক জরিপে AM Best জানায়, প্রায় ৬০ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান মনে করে ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে এআই তাদের ব্যবসায়িক মডেল মৌলিকভাবে পরিবর্তন করবে। এই পূর্বাভাস বীমা খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
এই প্রসঙ্গে এএম বেস্টের শিল্প গবেষণা বিশ্লেষক কাইটলিন পিয়াসেকি উল্লেখ করেন, পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থা এআই বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে, কারণ এগুলো আধুনিক ডেটা সংহতকরণের জন্য তৈরি করা হয়নি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ডিরেক্টর শ্রীধর মান্যেম বলেন, ডেটা যদি বিচ্ছিন্ন বা সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তবে এআই-এর ফলাফল নির্ভরযোগ্য হয় না এবং এর কার্যকারিতা কমে যায়।
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বীমা খাতে এআই বিনিয়োগের আগ্রহ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এএম বেস্টের তথ্য অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ বীমা প্রতিষ্ঠান ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে এআই বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। এটি প্রযুক্তি গ্রহণে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দেয়।
যেসব প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এআই ব্যবহার করছে, তাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ সীমিত হলেও উৎপাদনশীলতায় উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে। পাশাপাশি ১১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, কর্মীপ্রতি উৎপাদনে (output per employee) পরিমাপযোগ্য উন্নতি অর্জিত হয়েছে। যদিও এই উন্নতি এখনও সর্বজনীন নয়, তবুও এটি এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রাথমিক প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, প্রতিবেদনগুলো থেকে স্পষ্ট হচ্ছে যে বীমা খাতে এআই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক কাঠামো পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সুফল অর্জনের জন্য ডেটা একীকরণ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং পুরোনো সিস্টেম সংস্কারের মতো মৌলিক চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে