প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত ক্ষতির কারণে আগামী দুই দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রায় ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান মুডিসের (Moody’s) এক নতুন প্রতিবেদনে এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে বীমা সুরক্ষা সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং বীমা কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত দাবির মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের কারণ। মুডিস এই পরিস্থিতিকে “ইনস্যুরেন্স প্রোটেকশন গ্যাপ” বা বীমা সুরক্ষা ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে, এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি পদ্ধতিগত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি হলেও যদি তার বড় অংশ বীমার আওতায় না থাকে, তাহলে সেই আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর এসে পড়ে। এর ফলে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মুডিসের তথ্য বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সুরক্ষা ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এসব দেশে বীমা গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম। একই সময়ে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে নতুন নতুন অবকাঠামো, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং উচ্চমূল্যের সম্পদ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেসব সম্পদের জন্য প্রয়োজনীয় বীমা সুরক্ষা সমান গতিতে বাড়ছে না। ফলে দুর্যোগের সময় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হয়ে উঠছে।
আঞ্চলিক তুলনায়ও উল্লেখযোগ্য বৈষম্য দেখা গেছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বীমা কভারেজ গড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশের সমান। অন্যদিকে বিশ্বের সাতটি বৃহৎ শিল্পোন্নত দেশের জোট জি–৭ ভুক্ত দেশগুলোতে এই হার প্রায় তিন গুণ বেশি, যা গড়ে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ জিডিপির সমান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চরম আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত আর্থিক ঝুঁকি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আরও জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ এলাকায় মানুষের বসতি বৃদ্ধি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য তথ্য
| সূচক | তথ্য |
|---|---|
| সম্ভাব্য অনাবৃত জলবায়ুজনিত ক্ষতি | ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার |
| সময়কাল | আগামী ২০ বছর |
| প্রতিবেদক প্রতিষ্ঠান | মুডিস |
| প্রধান ঝুঁকি | বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি |
| আলোচিত সমস্যা | ইনস্যুরেন্স প্রোটেকশন গ্যাপ |
| সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা ঘাটতি | উন্নয়নশীল অর্থনীতি |
| এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বীমা কভারেজ | জিডিপির ০.৮৩% |
| জি–৭ দেশগুলোর গড় বীমা কভারেজ | জিডিপির ২.৩৮% |
| বন্যা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষ (২০২০) | প্রায় ২.৭ বিলিয়ন |
| বৈশ্বিক জনসংখ্যার অনুপাত | প্রায় প্রতি তিনজনের একজন |
| ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণ | দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি |
মুডিসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৭০ কোটি মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করছিলেন, যেখানে বন্যার ঝুঁকি সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান। এটি বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনসংখ্যা ও সম্পদের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
মুডিসের মতে, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমা সুরক্ষা সম্প্রসারণ, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারে।



