খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনকে ঘিরে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগসংক্রান্ত এই সংশোধিত নীতিমালা প্রকাশের পরপরই ব্যাংকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, উদ্বেগ ও ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি বা সিইও পদে নিয়োগের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন। এটি পূর্ববর্তী রীতির তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন, কারণ আগে এমন নিয়োগ নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় না পড়ে মূলত বিচ্ছিন্ন ও ক্ষেত্রবিশেষে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো।
তবে এই যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কঠোর শর্ত। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থায় প্রার্থীর কমপক্ষে ২৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে এবং জাতীয় বেতন কাঠামোর দ্বিতীয় গ্রেডের সমমানের প্রথম শ্রেণির পদে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এসব শর্ত আরোপের উদ্দেশ্য হলো—ব্যাংক খাতের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে কেবল অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিরাই যেন আসীন হন।
এদিকে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতার মানদণ্ড বাড়ানো হয়েছে। নতুন নিয়মে এমডি পদে নিয়োগ পেতে হলে প্রার্থীকে অন্তত তিন বছর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অথবা অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আগে এই অভিজ্ঞতার সীমা ছিল দুই বছর। এই পরিবর্তন নিয়ে বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় ডিএমডি পদে আটকে থাকা এবং বয়সসীমার বাধা মিলিয়ে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা ভবিষ্যতে এমডি হওয়ার সুযোগ হারাতে পারেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ডিএমডি এ সিদ্ধান্তকে ব্যাংকিং নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ ধারার জন্য ‘উদ্বেগজনক বার্তা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান অবশ্য এই নীতিমালার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শীর্ষ পদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো কর্মকর্তা যদি ব্যাংকে যোগদানের আগে সংশ্লিষ্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।
তবুও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তাঁদের মতে, সাবেক নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের পূর্বপরিচয় বা পেশাগত সম্পর্ক থাকলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য প্রভাব পড়তে পারে, যা স্বার্থের সংঘাতের নতুন মাত্রা সৃষ্টি করতে পারে।
অতীতে কিছু নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ব্যাংকের শীর্ষ পদে দায়িত্ব নিলেও এবারই প্রথম এই পথকে আনুষ্ঠানিক নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো। ফলে একদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত স্বচ্ছতা আসলেও, অন্যদিকে বিতর্কও তীব্র হয়েছে। অনেকের চোখে এটি সংস্কার ও ঝুঁকির মাঝামাঝি এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য—যেখানে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হলেও, ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও সুশাসন রক্ষায় কঠোর নজরদারি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।