খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
ব্রাজিলীয় ফুটবলের সোনালী দিনগুলো এখন কেবলই স্মৃতি—ফুটবল প্রেমীদের এই আক্ষেপ দীর্ঘদিনের। ২০০২ সালের পর দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সেলেসাওরা বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। কেন পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা তাদের চিরচেনা শৈল্পিক ছন্দ ও জৌলুশ হারিয়ে ফেলছে, তা নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ও কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্রাজিলের ফুটবলের বর্তমান অধঃপতনের পেছনে দুটি সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।
রোমারিওর মতে, ব্রাজিলের ফুটবলের ঐতিহ্যের মূলে ছিল সৃজনশীলতা, যা বর্তমানে যান্ত্রিকতার কবলে পড়েছে। তিনি বিশেষত নিচের দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন:
১. রাস্তার ফুটবলের বিলুপ্তি (The Death of Street Soccer): ব্রাজিলের ফুটবলের প্রাণশক্তি ছিল এর অলিগলি এবং বস্তি বা ‘ফাভেলা’ থেকে উঠে আসা প্রতিভা। রোমারিও নিজেও রিও ডি জেনিরোর বস্তি এলাকায় ফুটবল খেলে বড় হয়েছেন, যেখানে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম ছিল না। তিনি মনে করেন, বর্তমানে ফুটবল অনেক বেশি ‘কাঠামোগত’ এবং ‘কৃত্রিম’ হয়ে পড়েছে। আধুনিক একাডেমিগুলোতে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের নির্দিষ্ট ছকে ফুটবল শেখানো হয়, যার ফলে তাদের সহজাত মেধা ও সৃজনশীল ড্রিবলিং ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
২. শারীরিক সক্ষমতার অতি-প্রাধান্য (Emphasis on Athleticism): আধুনিক ফুটবলে এখন শৈল্পিক ছোঁয়ার চেয়ে শারীরিক শক্তি ও গতির (Physicality) ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। রোমারিওর মতে, এই ‘অ্যাথলেটিসিজম’ বা পেশিশক্তির লড়াইয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ব্রাজিলের সেই চিরাচরিত ফুটবল শৈলী বা ‘ফ্লেয়ার’। একক দক্ষতায় রক্ষণভাগ তছনছ করে ম্যাচ জেতানোর মতো ফুটবলার তৈরির পথে এই শারীরিক ফুটবল একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটা সময় ছিল যখন ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে ব্রাজিলীয়দের জয়জয়কার ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল নিয়মিত বিশ্বসেরা ফুটবলার উপহার দিয়েছে। কিন্তু ২০০৭ সালে কাকার ব্যালন ডি’অর জয়ের পর আর কোনো ব্রাজিলীয় এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিততে পারেননি। নিচে ব্রাজিলের সর্বশেষ কয়েকজন ব্যালন ডি’অর বিজয়ীর তালিকা দেওয়া হলো:
টেবিল: ব্রাজিলের শেষ পাঁচ ব্যালন ডি’অর বিজয়ী
| সাল | খেলোয়াড়ের নাম | বর্তমান প্রেক্ষাপট ও অবস্থান |
| ১৯৯৭ | রোনালদো নাজারিও | প্রথম ব্রাজিলীয় হিসেবে এই পুরস্কার অর্জন |
| ১৯৯৯ | রিভালদো | বার্সেলোনার হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি |
| ২০০২ | রোনালদো নাজারিও | বিশ্বকাপ জয় ও ইন্টার মিলান/রিয়াল মাদ্রিদে আধিপত্য |
| ২০০৫ | রোনালদিনহো | বার্সেলোনার হয়ে ফুটবলে শৈল্পিক বিপ্লব |
| ২০০৭ | কাকা | মিলানের হয়ে জয়ের পর দীর্ঘ ১৮ বছরের খরা শুরু |
উল্লেখ্য যে, ১৯৯৫ সালের আগে অ-ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের ব্যালন ডি’অর দেওয়া হতো না। রোমারিও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জিতলেও সেই সময়কার নিয়মের কারণে ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি, যা নিয়ে তাঁর আক্ষেপ এখনো বিদ্যমান।
আগামী ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ব্রাজিল দল এখন পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞ নেইমার খেলবেন কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে রোমারিও মনে করেন, একক কোনো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরতা দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমানে দলে রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো প্রতিষ্ঠিত তারকাদের পাশাপাশি জোয়াও পেদ্রো ও এস্তেভাওয়ের মতো প্রতিভাবান তরুণরা উঠে আসছেন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গত মৌসুমে ব্যালন ডি’অরের খুব কাছাকাছি গেলেও শেষ পর্যন্ত তা অর্জন করতে পারেননি। রোমারিও বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়দের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যাতে ব্রাজিল আবারও তাদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, রোমারিওর এই বিশ্লেষণ কেবল ব্রাজিলের জন্যই নয়, বরং আধুনিক ফুটবল বিশ্ব কীভাবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলীয় কাঠামোকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তারও একটি প্রতিফলন। ব্রাজিলের ফুটবল জৌলুশ ফিরে পেতে হলে তাদের সেই আদি ও অকৃত্রিম ‘স্ট্রিট সকার’ সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় ঘটানো জরুরি বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।