খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত নৃশংসতার বিচার বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে। হত্যাকাণ্ড এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাটিতে সোমবার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে—আসামিপক্ষ প্রথমবারের মতো সাফাই সাক্ষী হাজির করে। সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শাহবাগ থানার তৎকালীন পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেন, যিনি মামলার অন্যতম গ্রেপ্তার হওয়া আসামি।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে এ মামলার সাক্ষ্য–প্রমাণ শুনানির কাজ পরিচালনা করছে। এই ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিচারিক প্রক্রিয়া এগোনোর সঙ্গে সাফাই সাক্ষ্য নতুন বিতর্ক এবং ব্যাখ্যার পথ খুলে দিল।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আটজনকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে চারজন পলাতক, আরশাদসহ চারজন বন্দী আছেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই হত্যাকাণ্ডকে সুপরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে আসামিপক্ষ দাবি করছে, ঘটনার দিন পুলিশের ভূমিকা বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ছবি ও ভিডিওর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আসামি আরশাদ। নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলামকে মুখ চেপে ধরার যে ছবি ভাইরাল হয়েছিল—সেই ছবি নিয়েই তিনি আদালতে বলেন, “ভিডিওর অংশবিশেষ কেটে সম্পাদনা করে সেটিকে ভিন্ন অর্থে উপস্থাপন করা হয়েছে।” তার দাবি অনুযায়ী, ঘটনাটি উপস্থাপনের সময় মূল প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হয়েছিল এবং কিছু অংশ ‘এডিট’ করে প্রচারের উপযোগী করা হয়।
জবানবন্দিতে আরশাদ আরও বলেন, “৫ আগস্ট আমি কোনো অস্ত্র ব্যবহার করিনি, কাউকে গুলি করিনি বা কাউকে গুলি করার নির্দেশ দিইনি। আমি কাউকে কোনোভাবেই ক্ষতি করিনি। আমি শুধু আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছি।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত, এবং পুলিশের দায়িত্ব ছিল এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে রাখা—যার অংশ হিসেবে তিনি আইনানুগভাবে কাজ করেছিলেন।
মামলায় এটি ছিল প্রথম সাফাই সাক্ষ্য হলেও আরশাদ জানিয়েছেন, তার পক্ষে মোট তিনজন সাক্ষী আদালতে হাজির হবেন। সোমবার তাদের মধ্যে আরেকজন উপস্থিত ছিলেন—মো. সোলাইমান, যিনি ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত বলে আদালতে জানান। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীতে পরিদর্শক আরশাদকে ওয়াকিটকি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তার দাবি—সেই মুহূর্তে আরশাদ কোনো সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন বলে মনে হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাফাই সাক্ষ্য মামলার গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষ যে ভিডিও ও ছবিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে দেখছে, আসামিপক্ষ সেই প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখন ট্রাইব্যুনালকে প্রযুক্তিগত প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি, ডিজিটাল ফুটেজ—সবকিছুই সূক্ষ্মভাবে যাচাই করতে হবে।
মামলায় আরও সাফাই সাক্ষী হাজির হওয়ার পর যুক্তিতর্কের পর্যায়ে যাবে আদালত। বিচারিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মামলাটি শুধু ব্যক্তিবিশেষের নয়—বরং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেও নতুনভাবে সামনে এনেছে। ফলে এই মামলার রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও রাজনীতি—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে।